হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের দুটি লাইনের আটটি প্যাকেজের নির্মাণকাজ পেয়েছে ভারত। এছাড়াও এ কাজের ঠিকাদারি পেয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব কাজের মোট চুক্তিমূল্য প্রায় ৫৮ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের ছয়টি প্যাকেজের মূল্য ৫৩ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-৫ (উত্তরা রুট, ১ম সংশোধিত) প্রকল্পের দুটি প্যাকেজের মূল্য চার হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার ঢাকায় সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত আটটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।লাইন-১-এর ট্র্যাক ওয়ার্কস ও বৈদ্যুতিক সুবিধার কাজ পেয়েছে ভারতের দুই প্রতিষ্ঠান এলঅ্যান্ডটি-সুমিটোমো কনসোর্টিয়া। এর চুক্তিমূল্য ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। সিগন্যাল, টেলিযোগাযোগ, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের কাজ পেয়েছে ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো লিমিটেড। এর মূল্য ছয় হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশি। দুটি প্যাকেজে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মূল্য প্রায় ১৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা, যা মোট মূল্যের প্রায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ।
লাইন-১ এর ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপনের জন্য ১১ হাজার ৬৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে জাপান-ভারতের যৌথ উদ্যোগ এল অ্যান্ড টি-সুমিতোমো কনসোর্টিয়াম (এল অ্যান্ড টি বিজনেস পার্কসহ)। টেলিকমিউনিকেশন এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর বসানোর জন্য ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি) ৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। একই লাইনের আওতায়, ডিপোর সিভিল ও বিল্ডিং কাজের জন্য চিনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো
করপোরেশন এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো ৮ করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগ ‘সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল জেভি’ ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। মেট্রোরেলের লাইন-১ ও ৫-এর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত ৮টি প্রস্তাবের আওতায় নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পেয়েছে জাপান, চিন, ভারত ও বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ কাজে ব্যয় হবে ৫৮ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ–সংক্রান্ত ৮টি প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, চারটি দেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেট্রোরেল লাইন-১ এবং মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট)-এর বিভিন্ন অংশে ডিপো নির্মাণ, সিভিল ওয়ার্কস, রেললাইন স্থাপন, সিগন্যালিং সিস্টেম ইনস্টল এবং স্টেশন তৈরির কাজ করবে। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড সরকারের নিজস্ব তহবিল এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে মোট ২ দশমিক ০৪ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে।
ক্রয় কমিটি মেট্রোরেল লাইন-১ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
এই রেললাইন রাজধানী ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নদ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত। নদ্দা থেকে রামপুরা পর্যন্ত মেইন লাইন ও স্টেশন নির্মাণের জন্য জাপানের
তোকিউ কনস্ট্রাকশন ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (এমআইএল) যৌথ উদ্যোগ ‘তোকিউ-এমআইএল’ ১৮ হাজার ৩৭ কোটি টাকার কার্যাদেশ পেয়েছে। আরেকটি প্রস্তাবের আওতায়, নদ্দা থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার মেইন লাইন ও স্টেশন নির্মাণের জন্য ১১ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নদ্দা ভূগর্ভস্থ স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ রুট তৈরির কাজ পেয়েছে জাপানি জয়েন্ট ভেঞ্চার—নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডা। লাইন ট্রানজিশন থেকে বালু নদী পর্যন্ত ৫ দশমিক ০০৭ কিলোমিটার মেইন লাইন ও স্টেশন নির্মাণের জন্য ২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে চিন রেলওয়ে গ্রুপ (সিআরইসি) এবং চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোং (এমবিইসি)-এর যৌথ উদ্যোগ।
ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের আওতায় দুটি বড় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। হেমায়েতপুর-আমিনবাজার এবং নদ্দা-ভাটারা সেকশনে এলিভেটেড মেইন লাইন ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণের জন্য ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে যৌথ উদ্যোগ ‘সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি’। ডিপোর সিভিল ও বিল্ডিং কাজের জন্য বাংলাদেশের কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হানিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের যৌথ উদ্যোগ ‘সিপিসি-হানিল জেভি’ ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ মেট্রোরেলের এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করছে। বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি রয়েছে।
ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড মোট তিনটি প্যাকেজে অংশীদার। এর একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এবং দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের হাতে সিংহভাগ মোট চুক্তিমূল্যের অর্ধেকের বেশি কাজ পেয়েছে জাপানের প্রতিষ্ঠান। লাইন-১-এর সবচেয়ে বড় প্যাকেজ রামপুরার উত্তর থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত মেইন লাইন ও স্টেশন নির্মাণের কাজ পেয়েছে টোকিও-এমআইএল যৌথ উদ্যোগ। এর চুক্তিমূল্য ১৮ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া নর্দ্দা
স্টেশনের উত্তর থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার অংশের মেইন লাইন ও স্টেশনের কাজ পেয়েছে নিশিমাৎসু-টিপিএল-তোদা যৌথ উদ্যোগ। এর মূল্য ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। দুটি প্যাকেজ মিলিয়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার কাজ, যা মোট মূল্যের প্রায় ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ।
চিনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগ তিনটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে। লাইন-১-এর ডিপোতে পূর্ত ও ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছে সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ, মূল্য চার হাজার ২৮৫ কোটি ছয় লাখ টাকার বেশি। একই লাইনের ট্রানজিশন থেকে বালু নদীর শুরু পর্যন্ত ৫ দশমিক ০০৭ কিলোমিটার অংশের কাজ পেয়েছে সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ,
মূল্য দুই হাজার ৫৩৪ কোটি ৯ লাখ টাকার বেশি। লাইন-৫-এর হেমায়েতপুর স্টেশন থেকে আমিনবাজার ট্রানজিশন এবং নতুন বাজার ট্রানজিশন থেকে ভাটারা স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেড অংশের মেইন লাইন ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণের কাজও তারা পেয়েছে, যার মূল্য দুই হাজার ৬৭০ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বেশি।
তিন প্যাকেজ মিলিয়ে চিনা প্রতিষ্ঠান নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগগুলো পাচ্ছে প্রায় ৯ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার কাজ। লাইন-৫-এর ডিপোতে পূর্ত ও ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছে সিপিসি-হানিল যৌথ উদ্যোগ। এতে আছে বাংলাদেশের কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হানিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। চুক্তিমূল্য এক হাজার ৮৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার বেশি।
