নয়াদিল্লি: বর্ষা বিদায় নিয়েছে। তবু অক্টোবরের মাঝামাঝি এসে উত্তর ভারতের আকাশে আচমকা ঘন মেঘ, বজ্রপাত আর প্রবল বৃষ্টি। সোমবার, ১২ অক্টোবর সকালে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় এমনই আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে বাসিন্দাদের। বর্ষার মরসুম শেষ হওয়ার পর এই অকাল বৃষ্টি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালিপনার কারণ কী? আবহবিদদের একাংশের মতে, এর পিছনে রয়েছে অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব, তার সঙ্গে উত্তর ভারতে সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সংঘাত। তবে দিল্লির এই বৃষ্টির একমাত্র কারণ হিসেবে এল নিনোকে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা, আবহাওয়ায় বড়সড় বদলের আশঙ্কা
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রজলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যেতে পারে। কোথাও খরা ও অনাবৃষ্টির আশঙ্কা বাড়ে, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে অস্বাভাবিক বৃষ্টি। এ বার এল নিনোর সম্ভাব্য তীব্রতা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে আবহবিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে।
বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের অধ্যাপক এবং ‘সাফার’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধিকর্তা গুফরান বেইগের ব্যাখ্যা, এ বারের এল নিনো সাধারণ পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। তাঁর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই ভারতের আবহাওয়ায় অনুভূত হচ্ছে। আসন্ন শীতেও তাপমাত্রার ওঠানামা অস্বাভাবিক হতে পারে। ফলে কখনও তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া, কখনও আবার হঠাৎ ঠান্ডা পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ‘সুপার এল নিনো’ শব্দবন্ধটি দিয়ে পরিস্থিতির সম্ভাব্য তীব্রতা বোঝানো হলেও, এর প্রভাব ভারতের প্রতিটি অঞ্চলে একই রকম হবে, এমনটা নয়। স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রের পরিস্থিতি, পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানের উপরেও বৃষ্টি ও তাপমাত্রার গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে।
বর্ষা শেষ, তবু দিল্লিতে এমন বৃষ্টি কেন?
দিল্লি-এনসিআরের সাম্প্রতিক বৃষ্টির তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিক থেকে আসা এই আবহাওয়াগত ব্যবস্থা উত্তর ভারতে মেঘ, বৃষ্টি এবং কখনও তুষারপাতের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে। শীতের মাসগুলিতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব বেশি দেখা গেলেও, বছরের অন্য সময়েও তা বৃষ্টি ঘটাতে পারে।
আবহবিদদের ব্যাখ্যা, উত্তর ভারতের উপরিভাগে অস্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ এবং তুলনামূলক উষ্ণ বাতাসের উপস্থিতির মধ্যেই সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা প্রভাব বিস্তার করে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সঙ্গে যুক্ত ঠান্ডা বাতাস যখন দিল্লি-এনসিআরের উপর থাকা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়ে। সেই পরিস্থিতিতে জমে থাকা জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়ার জন্ম দিতে পারে।
সাধারণত এই ধরনের আবহাওয়াগত ব্যবস্থার প্রভাবে হালকা বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি অনুকূল হলে বৃষ্টির তীব্রতা অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। দিল্লির সাম্প্রতিক বৃষ্টির ক্ষেত্রেও সেই অস্বাভাবিকতার দিকটিই সামনে এসেছে।
এ বার শীতেও কি বদলে যাবে আবহাওয়ার ছন্দ?
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও সতর্কতা বাড়ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে, এল নিনোর তীব্রতা সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের কৃষি, পানীয় জলের জোগান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে বর্ষার সরাসরি যোগ রয়েছে। এ বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে গড়ের তুলনায় প্রায় ১২.৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি অন্যতম দুর্বল বর্ষা। এল নিনোর সঙ্গে এই ঘাটতির সম্পর্ক রয়েছে বলে আবহবিদদের একাংশ মনে করছেন।
বর্ষায় কম বৃষ্টির পর শীতেও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা হলে কৃষি, জলসম্পদ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে দেশের কোথায় কতটা বৃষ্টি হবে, কোথায় শীতের তীব্রতা কমবে কিংবা কোথায় তাপমাত্রা দ্রুত বদলাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ, একাধিক রাজ্যে বৃষ্টির পূর্বাভাস
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১২ ও ১৩ অক্টোবর হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, দিল্লি এবং পঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ১৪ ও ১৫ অক্টোবর এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। সঙ্গে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঝোড়ো বাতাস এবং বিচ্ছিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে।
জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডেও আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাখণ্ডে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টি হতে পারে। অন্য দিকে, দক্ষিণ ভারতে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাব বাড়তে চলেছে। আগামী কয়েক দিনে কেরল, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশেও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ওড়িশা, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্যে আগামী দিনগুলিতে বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টি হতে পারে। ফলে বর্ষা বিদায়ের পরও দেশের আবহাওয়া যে দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে উঠবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, দিল্লির আচমকা বৃষ্টি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার বৃহত্তর ছবির দিকে নজর ফেরাচ্ছে। তবে এই বৃষ্টির পিছনে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ও স্থানীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এল নিনো সেই বৃহত্তর জলবায়ুগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এক দিনের বৃষ্টিকে তার একক ফল বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেই বোঝা যাবে, এ বারের শীত কতটা অস্বাভাবিক হতে চলেছে।
