বিশেষ প্রতিবেদন: ব্যবহারের পর যে জিনিসটি সাধারণত সোজা চলে যায় আবর্জনার স্তূপে, সেটিই কি এ বার হয়ে উঠতে পারে বাড়ি তৈরির উপকরণ? উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে চমকপ্রদ সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছেন জাপানের গবেষকেরা। ব্যবহৃত ডায়াপার কেটে, পরিষ্কার করে, শুকিয়ে তার অংশ বিশেষ কংক্রিট ও মর্টারে মিশিয়ে বালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বালির পরিবর্তে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়াপার-বর্জ্য ব্যবহার করা সম্ভব।
জাপানের কিতাকিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৩ সালে এই গবেষণাটি প্রকাশ করেন। লক্ষ্য ছিল এক দিকে ক্রমবর্ধমান ডায়াপার-বর্জ্যের সমস্যা কমানো, অন্য দিকে কম খরচে বাড়ি তৈরির উপায় খোঁজা। গবেষণার জন্য ব্যবহৃত ডায়াপার প্রথমে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তার পর সেগুলি ছোট ছোট টুকরো করে কংক্রিট ও মর্টারের উপাদানের সঙ্গে মেশানো হয়।
পরীক্ষায় অবশ্য দেখা যায়, ডায়াপারের পরিমাণ যত বাড়ে, নির্মাণসামগ্রীর চাপ সহ্য করার ক্ষমতা তত কমে। তাই বাড়ির সব অংশে একই পরিমাণ ডায়াপার ব্যবহার করা যাবে না। স্তম্ভ বা বিমের মতো কাঠামোগত অংশের ক্ষেত্রে ডায়াপার-বর্জ্য ব্যবহারের সীমা অনেক কম। গবেষণায় কাঠামোগত কংক্রিটে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত সূক্ষ্ম বালির অংশ বদলের সম্ভাবনা পাওয়া যায় নির্দিষ্ট শক্তিমানের ক্ষেত্রে। একতলা বাড়ির কিছু কাঠামোগত ব্যবহারে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিস্থাপনের ফলও পরীক্ষা করা হয়েছিল, তবে তার শক্তি তুলনামূলক ভাবে কম।
সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে দেওয়ালকে বাড়ির মূল ভার বহন করতে হয় না। অর্থাৎ, নন-লোড-বিয়ারিং পার্টিশন দেওয়ালের মর্টারে বালির বদলে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়াপার-বর্জ্য ব্যবহার করা যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এই মিশ্রণের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা প্রায় ২ মেগাপাস্কাল ছিল। মেঝে বা বাগানের পেভমেন্টের মতো কাজে অবশ্য সীমা আরও কম—প্রায় ৯ শতাংশ।
গবেষকেরা শুধু পরীক্ষাগারেই থেমে থাকেননি। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৩৬ বর্গমিটারের একটি কম খরচের বাড়ির নকশায় এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার হিসাব করা হয়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ওই বাড়ির নির্মাণে মোট প্রায় ২২.৭৯ ঘনমিটার যৌগিক নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ১.৭৩ ঘনমিটার ডায়াপার-বর্জ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ মোট নির্মাণসামগ্রীর আয়তনের প্রায় ৭.৬ শতাংশ আসতে পারে ব্যবহৃত ডায়াপার থেকে।
এই ভাবনার পিছনে রয়েছে দু’টি বড় সমস্যা। এক, সারা বিশ্বে ব্যবহৃত ডিসপোজেবল ডায়াপারের বিপুল বর্জ্য। দুই, বহু উন্নয়নশীল দেশে কম খরচে বাড়ির প্রয়োজন। সাধারণত ব্যবহৃত ডায়াপারের বড় অংশই মাটির নীচে পুঁতে ফেলা অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। সেই বর্জ্যকে যদি নির্মাণসামগ্রীর আংশিক বিকল্প হিসেবে কাজে লাগানো যায়, তা হলে একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে গবেষকেরাই সতর্ক করে দিয়েছেন, এখনই ডায়াপার দিয়ে বাড়ি বানানোর প্রচলিত পদ্ধতি শুরু করার মতো পর্যায়ে পৌঁছয়নি এই প্রযুক্তি। ডায়াপার সংগ্রহ, জীবাণুমুক্ত করা, শুকানো এবং টুকরো করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্মাণের নিরাপত্তা, মাটির ধারণক্ষমতা এবং বিভিন্ন কাঠামোর ভার বহনের ক্ষমতা নিয়ে আরও পরীক্ষা দরকার। আইন ও নির্মাণবিধিতেও প্রয়োজন হতে পারে পরিবর্তন।
অর্থাৎ, আজকের আবর্জনা হয়তো ভবিষ্যতের নির্মাণসামগ্রী হয়ে উঠতে পারে। শিশুর ব্যবহৃত ডায়াপার সরাসরি কোনও বাড়ির স্তম্ভ হয়ে উঠছে না ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট দেওয়াল ও স্থাপত্য উপাদানে তার অংশ বিশেষকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে। আবর্জনাকে সম্পদে পরিণত করার সেই পরীক্ষাই ভবিষ্যতের সস্তা এবং তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব আবাসনের নতুন দরজা খুলতে পারে।
