পুজোর ঢাকের আগেই বঙ্গে ফের বেজে উঠল ভোটের দামামা। তবে এবার বিধানসভা বা লোকসভা নয়, ভোট হতে চলেছে রাজ্যসভার তিনটি আসনে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই উপনির্বাচনের সূচি ঘোষণা করেছে। উপরিভাগে এটি তিনটি শূন্য আসনের নির্বাচন হলেও, রাজনৈতিক মহলের মতে এই ভোটের ফলাফল শুধু বাংলার রাজনীতিতেই নয়, সংসদের অঙ্কেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কবে রাজ্যসভার ভোট?
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪ জুলাই তিনটি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। তার আগে মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে ১৪ জুলাই পর্যন্ত, মনোনয়নপত্র যাচাই হবে ১৫ জুলাই এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ধার্য করা হয়েছে ১৭ জুলাই। সংসদের উচ্চকক্ষে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হবে ২৭ জুলাই। আসলে রাজ্যসভার এই তিনটি আসন শূন্য হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের পদত্যাগের কারণে। যথাক্রমে ৮, ১০ এবং ১১ জুন তাঁরা সাংসদ পদ ছাড়েন।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই উপনির্বাচন?
সাধারণভাবে রাজ্যসভার উপনির্বাচন খুব বেশি আলোচনায় না এলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। দীর্ঘদিনের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারিয়েছে। রাজ্যে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। এরপর থেকেই তৃণমূলে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। একদিকে লোকসভার একাধিক সাংসদ দল ছেড়েছেন, অন্যদিকে বিধানসভাতেও বড় অংশের বিধায়ক বিদ্রোহ করেছেন। ফলে একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলেও বর্তমানে বিধানসভায় তৃণমূলের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই রাজ্যসভার উপনির্বাচন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিধানসভার অঙ্ক কী বলছে?
রাজ্যসভার নির্বাচন হয় বিধানসভার নির্বাচিত বিধায়কদের ভোটে। বর্তমান সমীকরণ অনুযায়ী বিজেপি শিবির থেকে বিধানসভায় রয়েছেন ২০৮ জন বিধায়ক এবং তৃণমূল শিবির থেকে রয়েছেন ৮০ জন বিধায়ক। এই সংখ্যার ভিত্তিতে তিনটি আসনেই বিজেপি প্রার্থী দিলে তিনজনেরই জয়ের সম্ভাবনা প্রবল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। এমনকি তৃণমূলের অন্দরে যদি ক্রস ভোটিং হয়, তাহলে বিজেপির ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
তৃণমূলের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
এই নির্বাচন তৃণমূলের কাছে শুধুই তিনটি আসনের লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্বেরও পরীক্ষা। কারণ দল বর্তমানে দুই শিবিরে বিভক্ত। কোন শিবির আসল তৃণমূল, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছেও দাবি-দাওয়া জমা পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলের নাম ও প্রতীক নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, একটি রাজ্যসভা আসনে জিততে প্রায় ৭০টি ভোটের প্রয়োজন। কাগজে-কলমে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ক থাকলেও, দল ভাঙনের পর কোনও শিবির এককভাবে সেই সংখ্যা জোগাড় করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তৃণমূল আদৌ প্রার্থী দেবে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা চলছে।
বিজেপির সম্ভাব্য প্রার্থী কারা?
বিজেপির অন্দরে জোর আলোচনা, সদ্য তৃণমূল ছেড়ে আসা কয়েকজন প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদকেই এবার গেরুয়া শিবির প্রার্থী করতে পারে। যদিও দল এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নাম ঘোষণা করেনি। এই উপনির্বাচনের আগে তাঁদের বিজেপিতে যোগদান ঘিরে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
সংসদে কী লাভ হবে বিজেপির?
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য রয়েছে সংসদের অঙ্কে। রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যা আরও বাড়লে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করানো তুলনামূলক সহজ হবে। এনডিএ বর্তমানে রাজ্যসভায় সংখ্যাগতভাবে অনেকটাই শক্তিশালী। এই তিনটি আসন জিতলে সেই শক্তি আরও বাড়বে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ আইন বা সংবিধান সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সমর্থন সরকারকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে লোকসভাতেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এনডিএ শিবিরের সমর্থন বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক দল এবং বিদ্রোহী সাংসদদের সমর্থন পেলে কেন্দ্রের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের পথ আরও মসৃণ হতে পারে।
বাদল অধিবেশনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক গুরুত্ব
আগামী ২০ জুলাই থেকে সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। তার ঠিক চার দিন পরেই পশ্চিমবঙ্গের এই রাজ্যসভা উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে নতুন সাংসদরা দ্রুতই সংসদে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তি বাড়াতে পারেন।
নজর এখন তিনটি আসনে
তিনটি আসনের এই উপনির্বাচন সংখ্যার বিচারে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। একদিকে বিজেপির সামনে রাজ্যসভায় শক্তি বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ, অন্যদিকে তৃণমূলের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের কঠিন পরীক্ষা। আগামী ২৪ জুলাইয়ের ফল শুধু তিনটি আসনের ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না, তার প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণেও।




