হাওড়া: ভোটের টিকিট পাওয়ার দৌড়ে যেন বিরাম নেই! আবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে দু’দিন আগেই। কিন্তু তাতেও থামছে না প্রার্থীপদের দাবিদারদের ভিড়। হাওড়া পুরসভার আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে কাউন্সিলার হওয়ার আশায় দলের জেলা কার্যালয়ে জমা পড়েই চলেছে একের পর এক বায়োডেটা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আবেদন গ্রহণ বন্ধের নোটিস ঝোলাতে হয়েছে দলীয় নেতৃত্বকে। তার পরেও আবেদনের পাহাড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিজেপির নেতারা।
দলীয় সূত্রে খবর, নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও গত দু’দিনে প্রায় ১,৪০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক আবেদন ঘিরে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখন হাওড়া বিজেপির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। কোন ওয়ার্ডে কাকে প্রার্থী করা হবে, তা নিয়ে দলের অন্দরে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।
৬৮টি ওয়ার্ডে প্রার্থী বাছাই, নজরে তরুণ মুখ
দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, জমা পড়া বায়োডেটা খতিয়ে দেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম বাছাইয়ের কাজ শুরু করতে চলেছে মণ্ডল স্তরের নেতৃত্ব। প্রাথমিক পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর সেই তালিকা পাঠানো হবে জেলা নেতৃত্বের কাছে। আগামী ১ থেকে ৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থী বাছাই নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। জেলা সভাপতি গৌরাঙ্গ ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, সাত সদস্যের কোর কমিটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবে। তার পরে রাজ্য নেতৃত্বের অনুমোদন মিললেই প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত হবে।
কালীপুজো মিটলেই হাওড়া পুরসভার ৬৮টি ওয়ার্ডে বিজেপির প্রার্থী কারা হচ্ছেন, তা স্পষ্ট হতে পারে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একাধিক বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চাইছে দল। বুথ স্তরে গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা—এই বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা সভাপতি। পাশাপাশি, নিয়মিত এলাকায় ঘুরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানসিকতা রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। সেই সূত্রেই বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে তরুণ মুখকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে নেতৃত্ব।
টিকিটের লড়াইয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের আশঙ্কা
তবে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় দলের অন্দরে অসন্তোষ ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একটি ওয়ার্ডে একাধিক নেতা-কর্মী প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই প্রতিযোগিতা যাতে সাংগঠনিক সংঘাতে না গড়ায়, তা নিশ্চিত করাও নেতৃত্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গাপুজোর সময় শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ইছাপুরে দুই মণ্ডল সভাপতির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছিল।
ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে। ফলে পুরভোটের প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে দলের অন্দরে নতুন করে বিবাদ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের একাংশের। যদিও এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন গৌরাঙ্গ ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, ক্লাব স্তরের বিবাদ দলের আদর্শ কিংবা পুরভোটে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়ায় কোনও প্রভাব ফেলবে না।
পুরনো সাফল্যকে হাতিয়ার করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি
হাওড়ায় পুরভোটের লড়াইয়ে নিজেদের পুরনো সাফল্যকেও সামনে আনতে চাইছে বিজেপি। জেলা সভাপতির বক্তব্য, ২০১৩ সালের পুরভোটে হাওড়ার ৫০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৪ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছিলেন দলের দুই কাউন্সিলার। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের বঞ্চনার অভিযোগের মধ্যেও ওই কাউন্সিলাররা নিজেদের এলাকায় কাজ চালিয়ে গিয়েছেন।
আসন্ন পুরভোটে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনুন্নয়ন, বঞ্চনা এবং নাগরিক দুর্ভোগের অভিযোগকে প্রচারের হাতিয়ার করতে চাইছে পদ্মশিবির।
নাগরিক পরিষেবা, এলাকার উন্নয়ন এবং মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়লেও শেষ পর্যন্ত টিকিট পাবেন মাত্র ৬৮ জন। ফলে কাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পায়, আর কাদের হতাশ হয়ে ফিরতে হয়, তা নিয়ে এখন থেকেই কৌতূহল বাড়ছে দলের অন্দরে। বায়োডেটার পাহাড় থেকে যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার পাশাপাশি, টিকিট না-পাওয়া নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ সামলানোই হাওড়া বিজেপির সামনে বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।




