নিউজ ডেস্ক : দুর্গাপুজোর চার দিনের আনন্দ পেরিয়ে গিয়েছে। বিসর্জনের পর মন্ডপ ফাঁকা, উৎসবের আনন্দও কিছুটা স্নান হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, উত্তরবঙ্গের এক গ্রামে ছবিটা একেবারেই আলাদা। সেখানে ভক্তদের টানে আজও মর্ত্যে রয়ে গিয়েছেন দেবী। শতাব্দী প্রাচীন লোক কথাকে সঙ্গী করে প্রতিবছর নতুন করে ফিরে আসে উমার আরাধনা। বৃহস্পতিবার সেই ঐতিহ্য ঘিরেই উৎসবে মাতলো জলপাইগুড়ির এক গ্রাম।
জলপাইগুড়ি শহর ছাড়িয়ে রায়পুর চা বাগানের সবুজ গালিচা পার করলেই রংধামালি গ্রাম। বৃহস্পতিবার সেখানে সাড়ম্বরে পুজিতো হলেন দশভূজা। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী লক্ষ্মীপুজোর প্রথম বৃহস্পতিবার এই দুর্গা পূজো হয়। বনদূর্গা রুপে আরাধনা করা হয় মায়ের। এই পূজো মহারাজের পূজো বলেই পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, এই পূজো ৫০০ বছরেরও বেশী প্রাচীন। যদিও সঠিক দিনক্ষণ কারোরই জানা নেই। তবে স্থানীয়রা কমিটি তৈরী করে গত ১৪৪ বছর ধরে নিয়মিত পূজো করে আসছেন বংশপরম্পরায় । এইববছর ১৪৫ তম বর্ষে পদার্পণ করল এই পূজো। বর্তমানে একটি পূজো কমিটি তৈরী করে পূজোর আয়োজন করা হয়।
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী জানা যায়, মর্ত্যে পুজোর শেষে সপরিবার কৈলাসে ফিরছিলেন মা দুর্গা। অনেকটা পথ চলায় ক্লান্ত হয়ে, তিস্তানদী সংলগ্ন রংধামালি এলাকায় একটি বাগানে বিশ্রাম নিতে বসে পড়েন তিনি। তা জানতে পেরে ওই বাগানের মালিক মহারাজ নামে এক ধনী ব্যাক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে ছুটে আসেন। তাঁরা নানা ভাবে সেবা করেন মা দুর্গা ও তাঁর সন্তান-সন্ততিদের। তাঁকে সপরিবার এখানে একদিন থেকে যাওয়ার এবং পূজো নেওয়ার অনুরোধ করেন মহারাজ এবং গ্রামবাসীরা। তাঁদের ভক্তিশ্রদ্ধায় আপ্লুত দেবী সানন্দে রাজি হন পূজো নিতে। সেখানেই তাঁকে সপরিবার আরাধনা করেন সমস্ত গ্রামবাসী। তাতে খুশি হয়ে মা দুর্গা তাঁদের আশীর্বাদ করেন এবং বর দেন এই জায়গা শস্যশ্যামলা থাকবে চিরদিন। তখন থেকেই এখানে সাড়ম্বরে এই পুজো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মায়ের মন্দির। সেই মন্দিরেই গ্রামের সকলে মিলে পূজোর আয়োজন করেন। নিজের সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা করেন গ্রামবাসীরা।
লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী, কার্তিক ও মহাদেবের পাশাপাশি জয়া ও বিজয়ার প্রতিমা স্থান পেয়েছে এইখানে। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাবেকি প্রতিমা। চার দিনের বদলে এক দিনেই সমস্ত পুজো হয়। অর্থাৎ ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পুজো এক দিনেই সাঙ্গ করা হয়। কারণ মা এখানে একদিন অধিষ্ঠান করেছিলেন। আর যে হেতু মহারাজ নামে ওই ব্যাক্তির বাগানে এই পুজোর শুরু হয়েছিল, তাই এই এলাকায় মহারাজের দুর্গাপুজা নামেই এর পরিচিতি। এ ছাড়াও পাশেই রয়েছে কালীমন্দির। কালীপুজোর আয়োজন হয় সেখানে। দেবী দুর্গার সঙ্গে সঙ্গে মা কালীরও পুজো হয়। এই পুজোকে উপলক্ষ করে ওই চত্বরে বিশাল মেলাও বসেছে চারদিনের জন্য।
এই পুজো এবং মেলার আর একটা বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় যাঁরা বাইরে থাকেন তাঁরা সকলেই এই সময় ঘরে ফেরেন। বিশেষ করে বিবাহিত মেয়েরা শারদোৎসবে বাপের বাড়িতে আসতে না পারলেও মহারাজ মেলার সময় তাঁরা বাপের বাড়ি আসে। স্বামীর মঙ্গল কামনায় বিবাহিত মহিলাদের এদিন নতুন করে শাঁখাপলা পরার রেওয়াজ রয়েছে। বিসর্জনের বিষন্নতা কাটিয়ে রংধামালির এই পুজো যেন মনে করিয়ে দেয় দেবী শুধু কৈলাসের নন, ভক্তির টানে তিনি বারবার ফিরে আসেন বাংলার মাটিতেও।




