একদিকে নদীতে নামার মরসুম ঘনিয়ে আসছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের জঙ্গলে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অনুমতি পেতে নতুন জটিলতায় পড়েছেন হাজার হাজার মৎস্যজীবী। বন দফতরের অনুমতিপত্র বা 'পাশ' পেতে এবার অন্যান্য নথির পাশাপাশি অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা প্রিন্টেড আয় শংসাপত্র (ইনকাম সার্টিফিকেট) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে অভিযোগ। হাতে লেখা আয় শংসাপত্র নিয়ে যাওয়া বহু মৎস্যজীবীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ফলে জীবিকার তাগিদে জঙ্গলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া সুন্দরবনের বহু পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। কারণ, যাঁদের হাতে অনলাইন আয় শংসাপত্র নেই, তাঁদের অনেকেই জানেন না সেটি কোথা থেকে, কী ভাবে সংগ্রহ করবেন। তার উপর বহু পঞ্চায়েতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা থাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে।
মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, বর্তমানে একাধিক পঞ্চায়েত প্রধান নিয়মিত দপ্তরে আসছেন না। আবার কয়েকটি পঞ্চায়েতের প্রধান আইনি জটিলতায় জেলে থাকায় শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াই কার্যত থমকে রয়েছে। ফলে দিনমজুর ও গরিব মৎস্যজীবীরা এক দফতর থেকে অন্য দফতরে ঘুরেও সমাধান পাচ্ছেন না।
এই সমস্যা এমন সময় তৈরি হয়েছে, যখন সুন্দরবনের জঙ্গলে মাছ ধরার অনুমতির আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন ৪ অগস্ট। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে না পারলে চলতি মরসুমে জঙ্গলে যাওয়ার অনুমতি মিলবে না বলেই আশঙ্কা তাঁদের।
এর আগে সুন্দরবনে মাছ ধরার অনুমতিপত্র নিয়ে বড়সড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়, ক্যানিংয়ের পরিবর্তে বসিরহাট রেঞ্জের সজনেখালি ও ঝিলা অফিস থেকে অনুমতিপত্র ও পাশ দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন ক্যানিং মহকুমার মৎস্যজীবীরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, দূরবর্তী অফিসে গিয়ে আবেদন করা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
লাগাতার আন্দোলন ও চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত বদল করে। কয়েক দিন আগে ঘোষণা করা হয়, ক্যানিং থেকেই আবার অনুমতিপত্র দেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আবেদন করতে গিয়েই সামনে এসেছে নতুন শর্ত।
মৎস্যজীবীদের দাবি, টাইগার রিজার্ভের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে শুধু 'ইনকাম সার্টিফিকেট' জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে, সেটি অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা প্রিন্টেড শংসাপত্র হতে হবে। অথচ এখন আবেদন গ্রহণের সময় সেই নথিই চাওয়া হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে সুন্দরবন মৎস্যজীবী যৌথ সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক গোবিন্দ দাস বলেন, "বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ইনকাম সার্টিফিকেটের কথা লেখা ছিল। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা প্রিন্টেড সার্টিফিকেট না হলে আবেদন নেওয়া হবে না। এতে বহু গরিব মৎস্যজীবী সমস্যায় পড়েছেন।"
তিনি আরও বলেন, "যাঁরা প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান, তাঁদের অনেকেরই ডিজিটাল পরিষেবা সম্পর্কে ধারণা নেই। অনেকে আবার এমন এলাকায় থাকেন, যেখানে এই ধরনের শংসাপত্র সংগ্রহ করাই কঠিন। ফলে নতুন নিয়ম তাঁদের জীবিকাকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।"
সুন্দরবনের বহু পরিবারের কাছে জঙ্গল মানেই জীবিকার একমাত্র ভরসা। বাঘের আক্রমণ, কুমিরের ভয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস— সব ঝুঁকি নিয়েই বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে নামেন তাঁরা। সেই মানুষগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে বড় বাধা আর প্রাকৃতিক বিপদ নয়, বরং একটি 'অনলাইন আয় শংসাপত্র'।
মৎস্যজীবীদের দাবি, আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি হাতে লেখা বা স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া বৈধ আয় শংসাপত্রও গ্রহণ করা হোক। না হলে বহু পরিবার এ বছর জঙ্গলে যেতে পারবেন না। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে তাঁদের রুজি-রোজগার এবং সংসারের হাঁড়িতে। সুন্দরবনের নদীতে নামার আগে তাই এবার লড়াই বাঘের সঙ্গে নয়, কাগজপত্রের জট কাটানোর সঙ্গে।




