নাম বদলালেই কি বদলে যায় ভূখণ্ডের পরিচয়? অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ফের মুখোমুখি ভারত ও চিন। অরুণাচলের ২৭টি জায়গা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে ভারতের সরকারি মানচিত্রে প্রচলিত নামেই চিহ্নিত করার পর দিল্লির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল বেজিং। চিনের দাবি, ভারতের এই পদক্ষেপ ‘অবৈধ’ এবং ‘অকার্যকর’। মঙ্গলবার তারই জবাবে কড়া বার্তা দিল নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের স্পষ্ট বক্তব্য, “অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতা বদলানোর ক্ষমতা কারও নেই।”
চলতি মাসের গোড়াতেই অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি জায়গা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে সরকারি ভাবে ভারতের মানচিত্রে তাদের প্রচলিত নামে চিহ্নিত করেছে দিল্লি। সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্রে এই নামগুলি নথিভুক্ত করার উদ্দেশ্য, সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওই এলাকাগুলির সঠিক পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সেগুলি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো।
ভারতের এই পদক্ষেপ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন অরুণাচলের একাধিক জায়গার নাম বার বার নিজেদের মতো করে বদলানোর চেষ্টা করছে চিন। বেজিংয়ের এই পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরেই মেনে নেয়নি নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, কোনও জায়গার ‘কাল্পনিক’ নাম তৈরি করে তা প্রকাশ করলেই তার ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যায় না। বরং এই ধরনের পদক্ষেপ সীমান্ত সমস্যা মেটানোর চেষ্টা এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করতে পারে।
এ বার ভারতের ২৭টি জায়গার নামকরণের বিরোধিতা করে সোমবার সরাসরি বিবৃতি দেয় চিন। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন দাবি করেন, ভারত যে ভাবে অরুণাচলের জায়গাগুলিকে ‘মান্য নাম’ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তা ‘অবৈধ, বাতিল এবং অকার্যকর’। চিন অরুণাচলকে নিজেদের ভাষায় ‘জাংনান’ বলে উল্লেখ করে এবং গোটা অঞ্চলটিকেই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
চিনের সেই দাবির পরই মঙ্গলবার দিল্লির পাল্টা অবস্থান। বিদেশ মন্ত্রক বুঝিয়ে দিয়েছে, নামের লড়াইকে ভারত কোনও ভাবেই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে এক করে দেখছে না। দিল্লির বক্তব্য, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে—কেউ কোনও জায়গার নাম অন্য ভাবে ব্যবহার করলেই সেই বাস্তবতা পাল্টাবে না।
ভারতের মানচিত্রে নতুন করে চিহ্নিত ২৭টি জায়গার মধ্যে রয়েছে লং জু। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি অবস্থিত এই এলাকা ভারত-চিন সীমান্ত ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৯ সালে সেখানে চিনা বাহিনীর প্রবেশকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হয়েছিল। তালিকায় রয়েছে আপার সুবনসিরি জেলার লং জু-র কাছে অবস্থিত মাজা গ্রামও। পাশাপাশি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গিরিপথও রয়েছে এই তালিকায়।
এর মধ্যে থাগ লা-ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের সঙ্গে এই এলাকার নাম জড়িয়ে রয়েছে। পূর্ব অরুণাচলের কৌশলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ জয়রামপুর-কে সরকারি মানচিত্রে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিন সীমান্ত এবং মায়ানমার সীমান্তের দিকে নিরাপত্তা ও রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে।
অরুণাচলের জায়গার নাম নিয়ে ভারত-চিনের টানাপড়েন অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সাল থেকে চিনের অসামরিক বিষয়ক মন্ত্রক অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গার জন্য নিজেদের নির্ধারিত নাম প্রকাশ করে আসছে। চলতি বছর এপ্রিলেও এমন একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল বেজিং। প্রতিবারই দিল্লি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের বক্তব্য, এ ভাবে নাম বদলের চেষ্টা আসলে অরুণাচলের উপর চিনের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।
নামকরণের এই পাল্টাপাল্টি তাই নিছক শব্দের লড়াই নয়। সীমান্তের মাটিতে যে দাবি, তারই কূটনৈতিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মানচিত্রে। একটি জায়গাকে কোন নামে ডাকা হবে, সরকারি নথিতে কোন নাম থাকবে—তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সার্বভৌমত্বের দাবি, প্রশাসনিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক স্তরে নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও।
ফলে ২৭টি জায়গাকে ভারতের সরকারি মানচিত্রে প্রচলিত নামে চিহ্নিত করার পর চিনের আপত্তি এবং তার জবাবে দিল্লির কড়া বার্তা—দুই দেশের সীমান্ত-সম্পর্কের পুরনো উত্তাপই নতুন করে সামনে আনল। নাম নিয়ে টানাপড়েন চলতেই পারে, কিন্তু দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—মানচিত্রে নাম বদলালেই অরুণাচল বদলাবে না।