স্পোর্টস ডেস্ক: ব্রাজিলের কাছে ৪ গোলের ধাক্কা সামলে এ বার আরও এক লাতিন মহারথীর সামনে ভারত। মঙ্গলবার কলকাতার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের মুখোমুখি হতে চলেছে খালিদ জামিলের দল। বেঙ্গালুরুতে পানামার বিরুদ্ধে লড়াকু ড্র, এবং যুবভারতীতেই ব্রাজিলের কাছে ০-৪ হারের পর এই ফিফা উইন্ডোতে ভারতের শেষ পরীক্ষাটিই যে সবচেয়ে কঠিন হতে চলেছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। তবে প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, কলকাতার মাটিতে ভারত নামছে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ নিয়েই। তিলোত্তমার ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও ম্যাচটি নিছক একটি প্রীতি ম্যাচ নয়। টিকিটের চাহিদা থেকে শুরু করে ম্যাচ ঘিরে উন্মাদনা, সব মিলিয়ে এটা ফের প্রমাণিত, কেন কলকাতাকে বলা হয় ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যে ভুলগুলি ভারতকে ডুবিয়েছিল, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে সেগুলি শুধরে অনেক বেশি সংগঠিত ফুটবল উপহার দেওয়াই এখন খালিদের প্রধান লক্ষ্য। লাতিন ফুটবলের গতি, শারীরিক সক্ষমতা এবং দ্রুত আক্রমণের মোকাবিলায় ভারতীয় ফুটবলারদের রক্ষণ থেকে আক্রমণ— সব বিভাগেই দিতে হবে সেরাটা।
ইতিহাসও অবশ্য ভারতের পক্ষে খুব একটা সুখকর নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে ভারত ও উরুগুয়ে এর আগে একবারই মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৮২ সালের নেহরু কাপে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে হয়েছিল সেই দ্বৈরথ। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় সেই ম্যাচে উরুগুয়ে ৩-১ গোলে জয় তুলে নিয়েছিল। লাতিন শক্তির সামনে ভারতের প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিল। তার পর কেটে গিয়েছে ৪৪ বছর। বিশ্ব ফুটবলের ছবিটা বদলেছে, ভারতীয় ফুটবলেও এসেছে একাধিক পরিবর্তন। কিন্তু সেই হারের স্মৃতি এখনও রয়ে গিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। ফলে মঙ্গলবারের ম্যাচে সরাসরি প্রতিশোধের কথা বলা হয়তো বাড়াবাড়ি হবে, তবে ঘরের মাঠে সেই পুরনো ক্ষত মুছে দেওয়ার সুযোগ যে ভারতের সামনে রয়েছে, তা বলাই যায়। বিশেষ করে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে হারের পর উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে যদি ভারত লড়াই ছুড়ে দিতে পারে, তা হলে সেটিই হতে পারে এই আন্তর্জাতিক পর্বে দলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা।
ভারত-উরুগুয়ে দ্বৈরথের ইতিহাসে আরও একটি ম্যাচ রয়েছে, যদিও সেটিকে ফিফা সরকারি আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি কোচির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে সাহারা মিলেনিয়াম কাপে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে ভারত ০-৩ গোলে হেরেছিল। তবে উরুগুয়ের মূল জাতীয় দল সেই ম্যাচে খেলেনি। তাদের অনূর্ধ্ব-২৩ বা ‘বি’ দল অংশ নিয়েছিল বলেই ফিফার খাতায় ম্যাচটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মর্যাদা পায়নি। তাই সরকারি পরিসংখ্যানে মঙ্গলবারের ম্যাচটি ভারত ও উরুগুয়ের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। আনফিশিয়াল ম্যাচটিকেও ধরলে অবশ্য এটি হবে তৃতীয় দ্বৈরথ। আর সেই ইতিহাসই বলে দেয়, লাতিন আমেরিকার এই শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভারতের কাজটা কতটা কঠিন। তার উপর উরুগুয়ের ডাগআউটে রয়েছেন এমন একজন, যাঁর সঙ্গে কলকাতারও পুরনো সম্পর্ক রয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতা ডিয়েগো ফোরল্যান এখন উরুগুয়ের কোচ। ২০১৬ সালে আইএসএলে মুম্বই সিটি এফসির হয়ে কলকাতায় খেলার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। অর্থাৎ মঙ্গলবার যুবভারতীতে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ডাগআউটেও হবে মস্তিষ্কের দ্বৈরথ। ফোরল্যানের সামনে খালিদ জামিল।
উরুগুয়ের স্কোয়াডে অবশ্য নেই রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ফেদেরিকো ভালভার্দে। চোটের কারণে বাইরে তিনি। তবু তাদের শক্তিতে খুব একটা টান পড়ছে না। আক্রমণভাগে ডারউইন নুনেজ এবং রক্ষণে রোনাল্ড আরাউজোর মতো বিশ্বমানের ফুটবলার থাকায় ভারতকে প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হবে। ভারতীয় শিবিরে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রক্ষণ জমাট রাখা এবং বল দখল হারালেই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো। মাঝমাঠে আকাশ মিশ্রদের লড়াই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই আক্রমণে মানভির সিংদের সুযোগ তৈরি করে তা কাজে লাগাতে হবে। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ভারতের রক্ষণে যে ফাঁকফোকরগুলি চোখে পড়েছিল, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে সেগুলি বন্ধ করাই প্রথম কাজ। পাশাপাশি ঘরের মাঠের দর্শকদের আবেগ ও সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই সাহসী ফুটবল খেলতে হবে ভারতকে। ফল যা-ই হোক, দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে ৯০ মিনিট মাথা উঁচু করে লড়াই করতে পারলে সেটিই হবে ভারতের বড় প্রাপ্তি। আর যদি ৪৪ বছর আগের ইডেনের গল্পের শেষটা মঙ্গলবার যুবভারতীতে বদলে দেওয়া যায়, তা হলে কলকাতার ফুটবল ইতিহাসে আরও একটি স্মরণীয় রাত যোগ হবে।
