বিশেষ প্রতিবেদন, দিব্যেন্দু ঘোষ: দিল্লির রাজনৈতিক এবং প্রতিবাদী সংস্কৃতির মানচিত্রে একটি দীর্ঘ ছায়া ফেলে দেওয়া পরিবর্তন ঘটে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও প্রশাসনের হরেক নির্দেশিকা এবং নিরাপত্তা ও ট্রাফিকের যুক্তির আড়ালে ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরকে সাধারণ রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও জনসভার আওতা থেকে কার্যত দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির বুক চিরে চলা প্রতিবাদের সেই পরিচিত কোলাহল, স্লোগান ও মাইকের আওয়াজ এখন আর যন্তর মন্তরে শোনা যাবে না। চেষ্টা করলেই খপাত।
আরশোলাদের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা চেষ্টা করেছিলেন গেট টপকে ভিতরে ঢোকার। পুলিশ আটকে করে। যন্তর মন্তরের পরিবর্তে, বিক্ষোভ প্রদর্শনের নতুন ঠিকানা রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং শাহদারার সিবিডি গ্রাউন্ড। প্রতীকী প্রতিবাদ থেকে শুরু করে রাজ্য ক্ষমতার বিরুদ্ধে রোষ আছড়ে পড়ার যে ঐতিহ্য যন্তর মন্তর দীর্ঘকাল ধরে বহন করে আসছে, তা আজ প্রশাসনিক বেড়াজালে অবরুদ্ধ। এই পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতার মনঃস্তত্ত্ব এবং সমাজতাত্ত্বিক বিন্যাস।
দিল্লির প্রতিবাদ মঞ্চের ইতিহাস মূলত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দরদখলের ইতিহাস। আঠারো শতকে মহারাজা জয় সিং দ্বিতীয়র তৈরি জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার এই প্রাচীন সৌধটি কীভাবে ভারতের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মক্কা হয়ে উঠল, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক বিবর্তন।
যন্তর মন্তর মানেই ক্ষমতার ঠিক নাকের ডগায় প্রতিবাদের প্রতীক। সংসদ ভবন এবং জনপথের খুব কাছে হওয়ায় যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের প্রথম পছন্দ ছিল। এখানে আন্দোলনকারীরা সরাসরি নীতিপ্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত। যন্তর মন্তরের মূল শক্তি ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। ক্ষমতার অলিন্দের ঠিক বাইরে জনতার সরাসরি হাঁকডাক দেওয়ার জায়গা।
অন্যদিকে রামলীলা ময়দান মানে গণআন্দোলনের ঐতিহাসিক কুরুক্ষেত্র। তারও রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৭০-এর জরুরি অবস্থা, কিংবা ২০১১ সালের আন্না হাজারে ও রামদেব-এর 'দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন'— সব বড় ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন এই ময়দানের সাক্ষী। বিশাল জনসমুদ্র তৈরির এক ঐতিহাসিক পরিসর। বুরারি ময়দান আবার প্রান্তিকীকরণের নির্বাসিত প্রান্তর। উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান মূল শহর থেকে বহু দূরে। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময় দিল্লিতে ঢোকার মুখে কৃষকদের আটকে বুরারি মাঠে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
বুরারি ময়দান হল মূলত মূলস্রোতের রাজনীতি ও জনদৃষ্টির আড়ালে প্রতিবাদকে ঠেলে দেওয়ার এক প্রশাসনিক বন্দোবস্ত। রামলীলা ময়দান ও বুরারি ময়দান থেকে সিবিডি গ্রাউন্ড কিছুটা আলাদা। এটি পূর্ব দিল্লির নতুন প্রশাসনিক মঞ্চ। পূর্ব দিল্লির শাহদারা এলাকার এই সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট গ্রাউন্ড অপেক্ষাকৃত আধুনিক সংযোজন। মূল ক্ষমতার কেন্দ্র লুটিয়েন্স দিল্লি থেকে বেশ দূরে অবস্থিত এই মাঠটিতে বড় জমায়েত করা সম্ভব হলেও, এটি রাজনৈতিকভাবে নীতিনির্ধারকদের সরাসরি প্রভাবিত করার পক্ষে অত্যন্ত প্রান্তিক।
যন্তর মন্তরকে নিষিদ্ধ বা সীমিত করার সিদ্ধান্তকে নিছক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বা আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও সমাজতাত্ত্বিক কারণ। গণতন্ত্রে দৃশ্যমানতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। যন্তর মন্তরের অবস্থান এমন এক জায়গায়, যেখান দিয়ে প্রতিদিন দেশের মন্ত্রী, সাংসদ এবং আমলারা যাতায়াত করেন। সরকারের চোখের সামনে প্রতিদিন বিরোধীদের পোস্টার, ব্যানার এবং স্লোগান দেখার এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতেই প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপ করেছে। বিক্ষোভকে চোখের আড়ালে নিয়ে যাওয়াই এর মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। রামলীলা ময়দান, বুরারি বা সিবিডি গ্রাউন্ডের মতো বড় প্রান্তরগুলো চারপাশ থেকে ঘেরাও করা সহজ।
এই স্থানগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে এবং জনস্রোতকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। যন্তর মন্তরের খোলামেলা ও ঘিঞ্জি শহুরে প্রকৃতি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল, কিন্তু নতুন মাঠগুলো পুলিশি নজরদারির অনুকূলে নিখুঁতভাবে তৈরি। যখন কোনও আন্দোলনকে শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে প্রান্তিক এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়, তখন মিডিয়ার কভারেজ, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং জনসমর্থনের গতিপ্রকৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। বুরারি বা সিবিডি গ্রাউন্ডের মতো জায়গায় সাধারণ মানুষ সহজে পৌঁছতে পারে না, ফলে প্রতিবাদের তেজ আপনাআপনি ঝিমিয়ে পড়ে। এটাই হল সুপ্ত মনস্তাত্ত্বিক দমননীতি, যেখানে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে না নিয়েও তার কার্যকারিতা ধ্বংস করে দেওয়া।
এই পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় গণতন্ত্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে দূরবর্তী পরিবর্তন আসছে। যন্তর মন্তরে ছোট ছোট সংগঠন, একা লড়ে যাওয়া প্রান্তিক মানুষ বা শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সহজেই নিজেদের দাবি নিয়ে বসতে পারত। কিন্তু রামলীলা ময়দান বা সিবিডি গ্রাউন্ডে বিশাল জমায়েতের জন্য যে বিশাল অনুমতি, পরিকাঠামো এবং আর্থিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয়, তা ছোট দল বা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে প্রতিবাদ আজ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের হাত থেকে বড় রাজনৈতিক দল বা কর্পোরেট সমর্থিত শক্তির কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল সরকারের প্রতি প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা। যন্তর মন্তরের মতো পরিসরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে নাগরিক সমাজের কণ্ঠকে শহরের কোণায় নির্বাসিত করা।
'ছু মন্তর' হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে যন্তর মন্তরের প্রতিবাদী উত্তরাধিকার। রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান বা সিবিডি গ্রাউন্ডে যতই বড় মাঠের প্রতিশ্রুতি থাকুক না কেন, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এই ভৌগোলিক দূরত্ব আসলে জনতা ও সরকারের মধ্যে দূরত্বকেই আরও বাড়িয়ে তুলছে। গণতন্ত্রে যখন প্রতিবাদের ভাষাকে শৃঙ্খলিত করা হয়, তখন সমাজ তার অন্তর্নিহিত ক্ষোভকে নতুন ও ভিন্ন পথে প্রকাশের পথ খুঁজে নেয়। যন্তর মন্তরের এই অবলুপ্তি তাই কোনও একটি জায়গার পরিবর্তন নয়, ভারতীয় গণতন্ত্রের নতুন ও উৎকণ্ঠাজনক অধ্যায়ের সূচনা।
