নিউজ ডেস্ক: শরতের নীল আকাশ জুড়ে ভাসছে সাদা মেঘ, মাঠের ধারে কাশফুলের চাদর। তারই মাঝে জঙ্গলমহলের আকাশে দেখা মিলছে নীলকন্ঠ পাখির। এই পাখির সাথে দুর্গা পুজোর এক যোগ আছে ও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিও শোনা যায়। উমা যখন মর্ত্যে কিছুদিন কাটিয়ে সন্তানদের সঙ্গে করে শ্বশুরবাড়িতে ফেরেন, সেই খবর শিবকে গিয়ে জানায় একটি নীলকণ্ঠ পাখি। এই বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অনেক জায়গায় বিসর্জনের প্রথা হচ্ছে সেই সময় একটা বা দুটো নীলকণ্ঠ পাখি নদীর ঘাটে উড়িয়ে দেওয়া। এছাড়াও কথিত আছে , নীলকণ্ঠ দর্শনের পর রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। লঙ্কা জয় করে ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে রাম ও লক্ষ্মণ শিবের আরাধনা করেছিলেন। সেই সময় শিব নীলকণ্ঠ পাখির রূপে মর্ত্যে এসেছিলেন। সম্ভবত এই প্রচলিত কাহিনীর কারণে আকাশে নীলকন্ঠ দেখলে শুভ কিছুর বার্তা বয়ে আসছে বলে মনে করা হয় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে।
‘‘নীলকণ্ঠ তুমি নীল থেকো, দুধভাত খেও, আমাদের কথা শিবকে জানিও।’’ - এই ছড়া কাটতে শোনা যায় জঙ্গলহলের মহিলাদের। বাড়ির তুলসীতলায় তারা এই ছড়া বলেন।
জঙ্গলমহলের ক্ষেত্রে বিশ্বাস দেবী দুর্গার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। এখানে নীলকণ্ঠকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতি। নীলকণ্ঠের পালক কুড়িয়ে বাড়ির কুলঙ্গিতে যত্ন করে রাখার রীতি রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, ঘরে এই পালক রাখলে ধনসম্পদ বাড়ে, সংসারে আসে সুখ-সমৃদ্ধি। বাচ্চারা বইয়ের পাতার মধ্যে রাখে পাখির পালক। গোপীবল্লভপুর, বিনপুর ও জামবনী ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় এই পাখির দেখা বেশি মেলে। জঙ্গলমহলের মানুষ বিশ্বাস করেন এই পাখি দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের লক্ষণ। কৃষক বন্ধু নামেও নীলকন্ঠৈর আলাদা পরিচিতি রয়েছে কারণ জমির ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে নিয়ে এরা ফসলকে রক্ষা করে।
জেলার পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, নীলকণ্ঠ পাখির প্রজননকাল মার্চ থেকে জুন মাস। পুরুষ নীলকণ্ঠপাখি এই সময়ে আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় যাতে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করতে পারে। বর্ষা ঋতুর পর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পুরুষ ও স্ত্রী নীলকন্ঠ বাসা বাঁধে ও খাবার সন্ধানে আকাশে ডানা মেলে। নীলকণ্ঠর চোখের পাশ ও কাঁধে নীল রং, শরীরে গোলাপি আভাযুক্ত বাদামি পালক দেখা যায়। আশ্বিন মাসে উড়ন্ত অবস্থায় ডানা ও লেজের উজ্জ্বল নীল রং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজয়া দশমীর সময় নীলকণ্ঠ ওড়ানোর রেওয়াজ থাকলেও ঝাড়গ্রামে এই রেওয়াজ খুব একটা দেখা যায়না। ঝাড়গ্রামের প্রাচীন রাজবাড়ী গুলোতে দুর্গা পুজো হলেও এখানে নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রচলন নেই। বরং এই জেলার মানুষ নীলকন্ঠের প্রতি সাংস্কৃতিক ও স্থানীয় লোকাচারকে বেশি গুরুত্ব দেন।
