স্পোর্টস ডেস্ক: একই প্রজন্মের দুই মহাতারকা। একজনের বিদায়ে চোখে জল, গ্যালারি জুড়ে আবেগ, সতীর্থদের অনুরোধ—‘থেকে যাও’। অন্য জনের বিদায়টা অনেক বেশি তিক্ত আর বিতর্কে মোড়া। আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর শেষ অধ্যায় যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়েও সম্পূর্ণ আলাদা দুই ছবি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে বেনিনকে হারিয়ে গোল করে, দু’টি গোলের পাস বাড়িয়ে মাঠ ছাড়লেন মেসি। ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে ৩৯ বছরের মহাতারকার সেই শেষ ম্যাচ পরিণত হল আবেগের বিস্ফোরণে। অন্যদিকে নরওয়ের বিরুদ্ধে নেশনস লিগের ম্যাচে পর্তুগালের ৪১ বছরের অধিনায়ক রোনাল্ডোকে প্রথম একাদশে রাখা তো দূরের কথা, মাঠেই নামানো হল না। কোচ জর্জ জেসুসের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যাচ শুরুর আগেই জাতীয় দল ছেড়ে কোপেনহেগেন থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির বিদায় তাই শুধুই একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়। একটি যুগের পর্দা নামা। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে ১২৬টি গোল, বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা, একটি ফাইনালিসিমা এবং অলিম্পিকে সোনা—দুই দশকের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে একের পর এক মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের কয়েক সপ্তাহ পরেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেসি। বাবার মৃত্যুও সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করেছিল। বিদায়ী ম্যাচে অবশ্য বোঝাই গেল, বয়স তাঁর পায়ের জাদু পুরোপুরি কেড়ে নিতে পারেনি। বেনিনের বিরুদ্ধে একটি গোল এবং দু’টি অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনার তিনটি গোলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে অবদান রাখলেন তিনি। বিশ্বকাপেও তাঁর পরিসংখ্যান ছিল ঈর্ষণীয়। ৮ গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট। ৩৯ বছর বয়সেও যে ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের সেরাটা বার করে এনেছেন, সেটাই হয়তো তাঁর বিদায়কে এতটা আবেগঘন করে তুলেছে।
আর মেসির এই বিদায়ের রাতেই তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন নেইমার। বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলার সময় থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব। মেসিকে উদ্দেশ্য করে নেইমার লিখেছেন, ফুটবলকে আরও বেশি ভালবাসতে শেখানোর জন্য তিনি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, গোটা বিশ্বই যে মেসিকে ধন্যবাদ জানায়, সেই কথাও উঠে এসেছে ব্রাজিলীয় তারকার বার্তায়। একই ভাবে মেসির বার্সেলোনার শুরুর দিনের সঙ্গী রোনাল্ডিনহোও ফিরে দেখেছেন তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্ক। তাঁর কথায়, মেসির সঙ্গে একই কাহিনীর অংশ হতে পারা ছিল আনন্দের। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার শৈশবের স্বপ্ন পূরণের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। পরিবার যে মেসির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে, সেটাও বুঝতে পারছেন বলে জানিয়েছেন রোনাল্ডিনহো। শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি বলেন, "এ বার জীবনটা উপভোগ করো, ভাই।"
অন্যদিকে মেসি এবং রোনাল্ডোর বিদায়ের এই বৈপরীত্য নিয়ে ফুটবল মহলেও আলোচনা তুঙ্গে। দু’জনেই একটি প্রজন্মকে নতুন একটি পরিভাষা দিয়েছেন। একে অপরকে অনুপ্রাণিত করেছেন, এবং বছরের পর বছর বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চ দাপিয়েছেন। কিন্তু শেষ বাঁশির আগে তাঁদের পরিস্থিতি যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। এল এম টেন শেষ ম্যাচেও পারফরম্যান্স দিয়ে নিজের বিদায়কে স্মরণীয় করে তুলেছেন। রোনাল্ডো অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে সেরা ছন্দে নেই। বিশ্বকাপে তিনটি গোল করলেও তাঁর গতি, মুভমেন্ট এবং বলের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবু এই পর্তুগিজ মহাতারকার ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তিনি আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারেন। কিন্তু মেসির বিদায়ে যেখানে গোটা ফুটবলবিশ্ব তাঁকে ধরে রাখতে চেয়েছে, সেখানে সিআর সেভেনের অধ্যায়টা আপাতত বিতর্ক আর অনিশ্চয়তায় ঢাকা। দুই কিংবদন্তির কেরিয়ার হয়তো এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁদের ‘শেষ বাঁশি’র গল্প যে একেবারেই এক নয়, তা স্পষ্ট।
