স্পোর্টস ডেস্ক: বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, এক দিন অলিম্পিক পদক জিতবেন। কিন্তু মনীষা ভানওয়ালার স্বপ্নটা আরও বড়। অলিম্পিক পদক নয়, দেশের হয়ে অলিম্পিক্সে সোনা জিততে চান তিনি। সেই স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলেন বাবা সুরেশ ভানওয়ালা। মেয়েকে কুস্তিগির হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়ের বিশ্বজয় দেখে যেতে পারেননি। ২০২২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন সুরেশ। বাবার মৃত্যুর চার বছর পর তাঁর স্বপ্নের প্রথম বড় ধাপ পূরণ করলেন হরিয়ানার জিন্দের ২৯ বছরের কুস্তিগির। মহিলাদের ৫৯ কেজি বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন মনীষা। এ বার তাঁর পাখির চোখ ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্স।
কাজাখস্তানের আস্তানায় বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আমেরিকার অ্যাবিগেল নেটের বিরুদ্ধে শুরুটা মোটেও ভাল হয়নি মনীষার। এক সময় ১-৬ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু হার মানেননি। দুরন্ত প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত ৮-৬ পয়েন্টে ফাইনাল জিতে নেন ভারতীয় কুস্তিগির। এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে সোনা জয়ের নজির গড়েছেন তিনি।কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক আবেগঘন কাহিনি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রথমেই নিজের পদক দেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েননি মনীষা। বরং বাবা-মায়ের ছবি ছাপানো একটি সাদা টি-শার্ট তুলে ধরেন। সেই ছবিতে ছিলেন তাঁর প্রয়াত বাবা। বিশ্বজয়ের মুহূর্তে বাবাকে পাশে পেতে চেয়েছিলেন তিনি। পদক জেতার পর বাবার ছবিটি নিজের বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়েছিলেন মনীষা। মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ভিডিয়ো কলেও কথা বলেন।
মনীষার কথায়, ‘আমার বাবা সাহাবই আমার সব কিছু। আমার গোটা জীবনটাই বাবাকে উৎসর্গ করা। উনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন। কখনও স্কুলে যাননি, লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু আমার কুস্তির সফরে সব সময় পাশে ছিলেন। অনেকে বলত, মেয়ে যখন, তখন লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়ে দাও। কিন্তু বাবা কারও কথা শোনেননি। আজ আমি যা হয়েছি, সবটাই বাবার জন্য। আমার মনে হয়, উনি এখনও আমার পাশে বসে আছেন। আমি যখন কুস্তির মাদুরে নামি, তখনও উনি আমাকে উৎসাহ দেন।’
কৃষক পরিবারের মেয়ে মনীষার ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল। তাঁর দাদা রিঙ্কু কবাডি খেলতেন। দাদার খেলা দেখেই খেলাধুলোর প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। পরে বাবার উৎসাহে কুস্তি শুরু করেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। নিজেদের জমিও ছিল না। বাবা নিজে মাঠে কাজ করতেন। অথচ মেয়ের প্রয়োজনীয় কোনও জিনিসের অভাব হতে দেননি। ২০১৫ সালে কুস্তি শুরু করার পর এক দিন বাবার কাছে সাত হাজার টাকার জুতো চেয়েছিলেন মনীষা। বাবা আশ্বাস দিয়েছিলেন, কোনও অসুবিধা হবে না। কয়েক দিনের মধ্যেই জুতো কিনে দিয়েছিলেন। আজও বাবার সেই ত্যাগের কথা ভুলতে পারেননি তিনি।
২০২২ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যাওয়ার ঠিক আগে বাবাকে হারান মনীষা। সেই সময় কুস্তি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর কার্যত ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু মা তাঁকে প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেন। মায়ের কথায়, ‘তোর বাবা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা তুই পূরণ না করলে কে করবে? এ ভাবে বসে থেকে কী হবে? যা, প্রতিযোগিতায় লড়াই কর।’ শেষ পর্যন্ত মঙ্গোলিয়ায় গিয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জেতেন মনীষা।
বাবার শেখানো গীতার কর্মযোগই জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে তাঁর। মনীষা বলেন, ‘বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন, হয় কোনও কাজে হাত দেবে না, নয়তো সেই কাজ শেষ করবে। এই শিক্ষাটাই আমার রক্তে মিশে গিয়েছে। কুস্তি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ পছন্দ। এই খেলাই আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, বাঁচার পথ দেখিয়েছে।’
বিশ্বজয়ের পর এ বার অলিম্পিক্সের প্রস্তুতি শুরু করতে চান মনীষা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৯ কেজি বিভাগে সোনা জিতলেও অলিম্পিক্সে এই বিভাগ নেই। সেখানে তাঁকে ৫৭ কেজি বিভাগে নামতে হবে। সেই প্রস্তুতিও শুরু করবেন তিনি। মনীষার কথায়, ‘বাবা সব সময় বলতেন, এক দিন অলিম্পিক্সে পদক জিতব। আমি বলতাম, বাবা, অলিম্পিক্স পদক নয়, অলিম্পিক্সে সোনা জিতব।’
লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০২৮ সালে সেই স্বপ্নই পূরণ করতে চান মনীষা। তাঁর কোচ বীরেন্দ্র দাহিয়াও আশাবাদী। তিনি বলেছেন, ‘মনীষা লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে পদক জিতবে। লিখে রাখুন, আমি আজই এই কথা বলছি।’ মনীষাও জানিয়েছেন, ‘২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে দেখা হবে। হাতে থাকবে পদক।’ বিশ্বজয়ের পর তাঁর লক্ষ্য এখন একটাই—বাবাকে দেওয়া কথা রেখে অলিম্পিক্সের মঞ্চে দেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরা।




