নিউজ ডেস্ক: খেলার রিংয়ে প্রতিপক্ষের ঘুষি সামলানোই একমাত্র লড়াই নয়। কখনও কখনও রিংয়ের বাইরের লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভারতীয় বক্সার পারভিন হুডার জীবন যেন তারই বড় দৃষ্টান্ত। ২২ মাসের নির্বাসনে হারিয়েছিলেন প্যারিস অলিম্পিক্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ। একই সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছিল পরিবারকে। এক দিকে নিজের কেরিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্য দিকে পরিবারের কঠিন পরিস্থিতি। সব বাধা পেরিয়ে এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন হরিয়ানার এই বক্সার। তাঁর কথায়, আমার কাছে খেলা একটা সাধনা।
পারভিনের কাছে এই সাফল্য শুধু একটি পদক নয়, বরং হারানো সম্মান ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ের স্বীকৃতিও। ২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ৫৭ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন তিনি। সেই সাফল্যের সুবাদে প্যারিস অলিম্পিক্সে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তিনবার নির্ধারিত নিয়মে নিজের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্ব ডোপ বিরোধী সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২২ মাসের নির্বাসনের কারণে অলিম্পিক্সে নামার স্বপ্ন ভেঙে যায়। তাঁর এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদকও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
এক জন ক্রীড়াবিদের কাছে অলিম্পিক্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ কতটা মূল্যবান, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম, অনুশীলন এবং আত্মত্যাগের পরে সেই জায়গায় পৌঁছান পারভিন। কিন্তু প্রতিযোগিতার মঞ্চে নামার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। নির্বাসনের সময় মানসিক ও শারীরিক ভাবে নিজেকে তৈরি রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বক্সিং থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি তাঁকে সামলাতে হয়েছে পরিবারের সমস্যাও।
পারভিনের বাবা লখপত হুডা গলার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসা চলাকালীন পরিবারের উপর চাপ বাড়তে থাকে। পারভিন নিজেও ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশে সাব-ইনস্পেকটর পদে কাজ করেন। বক্সিং থেকে পাওয়া পুরস্কারের অর্থ এবং নিজের উপার্জন দিয়ে বাবার চিকিৎসায় সাহায্য করেছেন তিনি। কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো ও নিজের অনুশীলন দুটিই করে গিয়েছেন সুচারুভাবে।
বাবার পাশে থাকার সুযোগও পেয়েছিলেন সেই সময়ে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেকে ভেঙে পড়তে দেননি তিনি। বরং ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে এনে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেন। নির্বাসন শেষ হওয়ার পরে নতুন উদ্যমে বক্সিংয়ে ফেরেন। বিভিন্ন টুর্নামেন্ট জিতে আত্মবিশ্বাসও ফিরে পান।
এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ৬৫ কেজি বিভাগে নামার সিদ্ধান্তও তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগের ৫৭ কেজি বিভাগ থেকে ওজন বাড়িয়ে নতুন বিভাগে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে বদলাতে হয়েছে লড়াইয়ের কৌশলও। কোচদের তত্ত্বাবধানে দূরত্ব বজায় রেখে আক্রমণ, সোজা ঘুষি এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ এড়িয়ে পাল্টা আঘাত করার দিকে জোর দেন তিনি।
এশিয়ান গেমসে পারভিনের পারফরম্যান্স ছিল ধারাবাহিক। কোয়ার্টার ফাইনালে উজবেকিস্তানের নাভবাখোর খামিদোভাকে ৫-০ ব্যবধানে হারান তিনি। সেমিফাইনালে চিনের লি শুর বিরুদ্ধেও একই ব্যবধানে জয় পান। ফাইনালে চিনা তাইপেইয়ের চেন নিন-চিনের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল কঠিন। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে সোনা নিশ্চিত করেন পারভিন।
পারভিনের এই জয় ভারতীয় বক্সিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ভারতের তৃতীয় মহিলা বক্সার হিসাবে এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলেন। এর আগে এম সি মেরি কম এবং লভলিনা এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পারভিনের সাফল্যের পিছনে রয়েছে বিশেষ এক প্রত্যাবর্তনের গল্প। সেই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলার নামী বক্সার মহম্মদ আলি কামার জানিয়েছেন, ‘‘পারভিন দেশের গর্ব, ওকে আমি ট্রেনিং দিয়েছি, জানি কতটা মনের জোর ওর। কোনওদিন প্র্যাকটিসে কামাই করেনি। মনের কত কষ্ট নিয়ে লড়ে গিয়েছে। ও সফল হবে না তো কে হবে, বলতে পারেন?’’
এ বার তাঁর লক্ষ্য ২০২৮ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক্স। প্যারিসে যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, আগামী অলিম্পিক্সে সেই আক্ষেপ মেটাতে চান ভারতের এই সোনার মেয়ে। যে কষ্টের পাহাড় টপকে এতটা এগিয়েছেন, তাঁকে দমাবে কার সাধ্যি!





