বেজিং, নিউজ ডেস্ক: রিংয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। দু’জনেরই শরীর মানুষের আদলে, কিন্তু তারা মানুষ নয়! দুই হিউম্যানয়েড রোবট। লড়াই জমে উঠেছে। আচমকাই এক রোবট ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ল দুরন্ত স্পিনিং হেড কিক। কিন্তু নিখুঁত আঘাত তো দূরের কথা, কিক মারতেই তাল কাটল! ভারসাম্য হারিয়ে সটান মাটিতে পড়ে গেল রোবটটি। আর প্রতিপক্ষ? কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করেই যেন জয়ের আনন্দে মেতে উঠল। শুরু করে দিল নাচ!
চিনের বেজিংয়ে চলা ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস-এর বক্সিং ম্যাচের এই দৃশ্য এখন নেটমাধ্যমে রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছে। পড়ে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীকে সামনে রেখেই বিজয়ী রোবটের ‘ভিক্টরি ডান্স’ দেখে হাসির রোল উঠেছে সমাজমাধ্যমে। ঘটনাটির ভিডিয়োও ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। ঘটনাটি দেখতে যতটা মজার, তার পিছনে ততটাই চমকপ্রদ প্রযুক্তির ছবি। ম্যাচে একটি রোবট আক্রমণের কৌশল হিসাবে ঘূর্ণায়মান কিক ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
কিন্তু আঘাতের আগে বা পরে ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে সেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষ রোবটটি তখন কিছুক্ষণ স্থির থাকে। তার পর আচমকাই শরীর দুলিয়ে শুরু করে দেয় নাচ। যেন রিংয়ের মাঝখানেই ঘোষণা—‘জয় আমার!’ মজার এই মুহূর্তের মধ্যেই অবশ্য উঠে এসেছে রোবট প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষ যেমন মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বুঝে শরীরের ভারসাম্য সামলে নেয়, রোবটের ক্ষেত্রে সেই কাজ এখনও যথেষ্ট কঠিন। বিশেষ করে দৌড়, লাফ, ঘূর্ণন বা আচমকা দিক পরিবর্তনের মতো কাজে যন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বেজিংয়ের এই প্রতিযোগিতাতেও তার একাধিক নজির মিলেছে।
এ বারের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে শুধু বক্সিং নয়, দৌড়, ফুটবল, টেবিল টেনিস, ভারোত্তোলন, নাচ-সহ নানা বিভাগে রোবটদের দক্ষতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২,০০০-এর বেশি হিউম্যানয়েড রোবট এবং ৬৬৬টি দল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। মোট ৫১টি বিভাগে চলছে লড়াই। রোবটদের দৌড়ের ছবিও কম চমকপ্রদ নয়। চিনের ‘তিয়াংগং আল্ট্রা’ ১০০ মিটার দৌড়ে ৮.৮৬ সেকেন্ড সময় করে মানব বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও দ্রুত দৌড়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এর আগে একই প্রতিযোগিতায় ৯.৩৯ সেকেন্ডের সময়ও নজর কেড়েছিল। অর্থাৎ যন্ত্রের গতি যে দ্রুত বাড়ছে, তার প্রমাণ মিলছে এই প্রতিযোগিতায়।
তবে গতি বাড়লেই যে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে, তা নয়। দ্রুত দৌড়ে শেষ লাইনে পৌঁছনোর পর অনেক রোবটই ঠিকমতো থামতে না পেরে নিরাপত্তা দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। কোথাও রোবট পড়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারোত্তোলনের একটি ইভেন্টেও ভারসাম্য হারিয়ে একটি রোবট বিচারকদের টেবিলের দিকে ছিটকে পড়েছিল। এই বৈপরীত্যই বেজিংয়ের রোবট গেমসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক—এক দিকে মানুষের রেকর্ড ভাঙার গতি, অন্য দিকে কয়েক পা পরেই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া। প্রযুক্তি যেন একই সঙ্গে বিস্ময়ও দেখাচ্ছে, আবার তার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
আর বক্সিং রিংয়ের সেই দৃশ্য যেন গোটা প্রতিযোগিতার ছবিটাই কয়েক সেকেন্ডে তুলে ধরল। এক রোবটের মাথা লক্ষ্য করে ঘূর্ণি কিক, পরের মুহূর্তেই তার পতন, আর তার পর বিজয়ী রোবটের নাচ! মানুষের খেলায় যন্ত্র ঢুকে পড়েছে অনেক দিনই। কিন্তু জয়ের পর প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করা রোবটের এই দৃশ্য যেন ভবিষ্যতের বিনোদনেরও এক ঝলক যেখানে লড়াই হবে যন্ত্রের, আর উল্লাসও করবে যন্ত্রই।