নয়াদিল্লি: নতুন নিয়মে বাড়তে পারে অবসরকালীন সঞ্চয়, আবার কমতে পারে মাসের হাতে পাওয়া বেতনও। কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিএফে বড় পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (ইপিএফও)-এর আওতায় বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তির জন্য মাসিক বেতনের ঊর্ধ্বসীমা ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর এই সিদ্ধান্তের ফলে এত দিন বাধ্যতামূলক পিএফের আওতার বাইরে থাকা আরও কর্মী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসবেন। একই সঙ্গে বদলাবে পিএফে জমার অঙ্ক, পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের হাতে পাওয়া মাসিক বেতনের হিসাব। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক কর্মীর পুরো বেতনের উপর স্বয়ংক্রিয় ভাবে পিএফ কাটা হবে। কার ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য, তা নির্ভর করবে তাঁর বেতন, আগের পিএফ ও পেনশন সদস্যপদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের শর্তের উপর।
১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার—কী বদলাল?
এত দিন মাসিক নির্ধারিত বেতন ১৫ হাজার টাকার বেশি হলে নতুন কর্মীদের ক্ষেত্রে ইপিএফের বাধ্যতামূলক সদস্যপদের নিয়ম সাধারণত প্রযোজ্য হত না। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সেই ঊর্ধ্বসীমা বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ফলে ১৫,০০১ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত বেতন পান, এমন আরও কর্মী বাধ্যতামূলক সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
এই পরিবর্তনের ফলে কর্মীদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধার পথ খুলতে পারে—প্রভিডেন্ট ফান্ডে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মচারী পেনশন প্রকল্পের সুবিধা এবং কর্মচারী আমানত-সংযুক্ত বিমা প্রকল্পের আওতায় বিমা সুরক্ষা। তবে তিনটি সুবিধাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নিয়ম ও যোগ্যতার শর্তসাপেক্ষ। বিশেষ করে পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন সদস্য এবং আগে থেকেই পেনশন প্রকল্পের সদস্য—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
২৫ হাজার টাকা বেতন হলে পিএফে কত জমবে?
নতুন ঊর্ধ্বসীমার প্রভাব বুঝতে একটি হিসাব দেখা যাক। ধরে নেওয়া যাক, কোনও কর্মীর পিএফ গণনার জন্য নির্ধারিত মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং তাঁর ক্ষেত্রে কর্মী ও নিয়োগকর্তার ১২ শতাংশ করে অবদানের নিয়ম প্রযোজ্য। আগে ১৫ হাজার টাকার সীমা ধরে কর্মীর মাসিক পিএফ অবদান হত ১,৮০০ টাকা। নতুন সীমা অনুযায়ী তা বেড়ে হতে পারে ৩,০০০ টাকা। অর্থাৎ, কর্মীর নিজের বেতন থেকে পিএফে জমা বাড়বে মাসে ১,২০০ টাকা। এর ফলে হাতে পাওয়া বেতন কমতে পারে। তবে এই টাকা হারিয়ে যাচ্ছে না; নিয়ম অনুযায়ী তা কর্মীর অবসরকালীন সঞ্চয়ের অংশ হচ্ছে।
নিয়োগকর্তার অবদানের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ হাজার টাকার ১২ শতাংশ হিসাবে নিয়োগকর্তার মোট অবদান ৩,০০০ টাকা। এর মধ্যে ৮.৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২,০৮৩ টাকা যোগ্য কর্মীর পেনশন তহবিলে যায়। বাকি প্রায় ৯১৭ টাকা জমা হয় পিএফে। ফলে কর্মীর নিজের ৩,০০০ টাকা এবং নিয়োগকর্তার পিএফে জমা হওয়া প্রায় ৯১৭ টাকা মিলিয়ে প্রতি মাসে পিএফ অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩,৯১৭ টাকা। এর বাইরে নিয়োগকর্তার পেনশন তহবিলে দেওয়া প্রায় ২,০৮৩ টাকা আলাদা ভাবে হিসাব করা হয়। অর্থাৎ, পিএফে কর্মীর নিজের অবদান বাড়লেও তার সঙ্গে অবসরকালীন সঞ্চয়ও বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত বেতন থেকে কত টাকা কাটা হবে, তা নির্ভর করবে কর্মীর প্রযোজ্য বেতন-সংজ্ঞা, অবদানের ভিত্তি এবং সংস্থার নিয়মের উপর।
হাতে পাওয়া বেতন কমবে কেন?
নতুন নিয়মের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে মাসের বেতনে। কারণ, পিএফে কর্মীর অবদান বাড়লে হাতে পাওয়া বেতনের অঙ্ক কমে যেতে পারে। ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত বেতনের উদাহরণে, আগে কর্মীর নিজের অবদান ছিল ১,৮০০ টাকা; এখন তা ৩,০০০ টাকা হলে মাসে হাতে পাওয়া অর্থ কমবে ১,২০০ টাকা। তবে নিয়োগকর্তার অবদানকে কর্মীর বেতন থেকে কেটে নেওয়া যাবে—এমন নয়। কর্মী ও নিয়োগকর্তার অবদান আলাদা দায়।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সংস্থার বেতন কাঠামো যদি ‘কস্ট টু কোম্পানি’ বা সিটিসি-ভিত্তিক হয়, তা হলে নিয়োগকর্তার বাড়তি অবদান মোট পারিশ্রমিকের হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু বেতনপত্রে পিএফের অঙ্ক নয়, মোট পারিশ্রমিক, হাতে পাওয়া টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়—তিনটিই মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২৫ হাজারের বেশি বেতন? পুরো টাকার উপর পিএফ কাটা বাধ্যতামূলক নয়
মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই পুরো বেতনের উপর স্বয়ংক্রিয় ভাবে পিএফ কাটা হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রযোজ্য প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমা পর্যন্ত অবদান রাখা যেতে পারে। আবার কর্মী ও নিয়োগকর্তার সম্মতিতে পুরো বেতনের উপর অবদান দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে, যেখানে সীমার অতিরিক্ত অংশ স্বেচ্ছামূলক অবদান হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তাই কারও বেতন ৩৫ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা হলে তাঁর পিএফের হিসাব সরাসরি পুরো বেতনের ১২ শতাংশ ধরে করা যাবে না। তিনি আগে থেকেই ইপিএফের সদস্য কি না, তাঁর ক্ষেত্রে কোন অবদানের ভিত্তি প্রযোজ্য এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে কী ব্যবস্থা রয়েছে—এসব খতিয়ে দেখা জরুরি।
পেনশনে কি বাড়তি সুবিধা মিলবে?
ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক কর্মচারী পেনশন প্রকল্প বা ইপিএস। আগে ১৫ হাজার টাকার বেশি নির্ধারিত বেতন নিয়ে প্রথম বার চাকরিতে যোগ দেওয়া অনেক কর্মী পেনশন প্রকল্পে নতুন সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতেন না। নতুন নিয়মে নির্ধারিত বেতন ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে যোগ্য কর্মীদের পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাড়ছে।
তবে পিএফ সদস্য হলেই যে প্রত্যেকে নতুন করে পেনশন প্রকল্পে যোগ দিতে পারবেন, তা নয়। যাঁরা আগে থেকেই ইপিএসের সদস্য, তাঁদের ক্ষেত্রে সদস্যপদের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আবার ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতন নিয়ে নতুন করে যোগ দেওয়া এবং আগে কখনও ইপিএসের সদস্য না হওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে পেনশনের নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই পেনশন মিলবে না, আবার সেই বেতনসীমার মধ্যে থাকলেই সব শর্ত ছাড়াই পেনশন নিশ্চিত—এমনটাও নয়। পেনশনের অঙ্ক নির্ধারণে পেনশনযোগ্য বেতন, পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদ এবং প্রকল্পের নির্ধারিত সূত্র গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ঊর্ধ্বসীমা যোগ্য সদস্যদের ক্ষেত্রে পেনশনযোগ্য বেতনের হিসাব বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পেনশন কত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সদস্যপদ ও চাকরির ইতিহাসের উপর।
নিয়োগকর্তাদেরও বদলাতে হবে বেতনের হিসাব
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় সংস্থাগুলিকে কর্মীদের তালিকা ও বেতন কাঠামো নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে। যাঁরা আগে বাধ্যতামূলক পিএফের আওতায় ছিলেন না, তাঁদের মধ্যে কারা এখন যোগ্য, তা চিহ্নিত করতে হবে। সেই অনুযায়ী বেতন থেকে অবদান কাটা, নিয়োগকর্তার অংশ জমা, পেনশন তহবিলের হিসাব এবং ইপিএফও-তে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও হালনাগাদ করতে হবে।
কর্মচারী আমানত-সংযুক্ত বিমা প্রকল্প বা ইডিএলআইয়ের অবদানও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বেতনের সীমার পরিবর্তনে প্রভাবিত হতে পারে। ফলে নিয়োগকর্তার মোট খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলিকে নতুন নিয়ম মেনে বেতন ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণে সতর্ক থাকতে হবে।
কর্মীদের এখন কী করা উচিত?
প্রথমেই নিজের বেতনপত্রে পিএফের হিসাব পরীক্ষা করা দরকার। কর্মীর নিজের অবদান কত, নিয়োগকর্তার অংশ কত, পেনশন তহবিলে কত টাকা যাচ্ছে এবং নতুন ঊর্ধ্বসীমা কী ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে—তা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নিজের ইউনিভার্সাল অ্যাকাউন্ট নম্বর বা ইউএএন-এর মাধ্যমে পিএফের জমা ও সদস্যপদের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
যাঁদের বেতন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়মে সদস্যপদের যোগ্যতা তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়োগকর্তার কাছে নিশ্চিত করা জরুরি। আর যাঁদের বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি, তাঁদের পিএফের অবদান নির্ধারিত সীমায় হচ্ছে, নাকি পুরো বেতনের উপর—সেটিও জেনে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, পিএফের ঊর্ধ্বসীমা ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা হওয়া কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে অনেকের অবসরকালীন সঞ্চয় ও পেনশন-সুরক্ষার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে তার বিনিময়ে কিছু কর্মীর হাতে পাওয়া মাসিক বেতন কমতে পারে। তাই নতুন নিয়মকে শুধু বেতন কাটার পরিবর্তন হিসেবে না দেখে, বর্তমান আয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার ভারসাম্য হিসেবেও বিচার করা প্রয়োজন।
