শিলিগুড়ি: দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতির পর বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই দলের একাংশের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে গেরুয়া শিবিরে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তোলাবাজি, টেন্ডার ও ঠিকাদারি ঘিরে সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা এবং এলাকা দখলের অভিযোগে বারবার নাম জড়াচ্ছে বিজেপির নেতা-কর্মীদের একাংশের। সেই পরিস্থিতিতে দলের অভ্যন্তরে ‘বিচ্যুতি’র কথা কার্যত স্বীকার করে নিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, এই প্রবণতা চিহ্নিত করে সংশোধনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপও করা হতে পারে।
বৃহস্পতিবার শিলিগুড়িতে দলের সাংগঠনিক বৈঠক এবং সাংবাদিক সম্মেলনে শমীক বলেন, বিজেপির কিছু অংশে বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। অন্যান্য জেলার মতো শিলিগুড়িতেও এই সমস্যা রয়েছে। বিষয়গুলি চিহ্নিত করার কাজ চলছে এবং দলের অন্দরেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা দলই ঠিক করবে। শো-কজ, সাসপেনশন না কি বহিষ্কার—কোন পথে এগোনো হবে, সেই সিদ্ধান্তও সাংগঠনিক স্তরেই নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় ক্ষমতা দখলের পর বিজেপির সামনে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসন পরিচালনার পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিরোধী অবস্থানে থেকে আন্দোলন করা আর শাসকদল হিসেবে সংগঠন পরিচালনা করার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, নতুন পরিস্থিতিতে তারই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে গেরুয়া শিবিরকে।
দলের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি তাই শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার প্রশ্ন নয়, ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কতটা বজায় থাকছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
টেন্ডার-ঠিকাদারিতে নজর, দলীয় কাজে অবহেলা?
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং টেন্ডার-ঠিকাদারি ঘিরে দলের নেতা-কর্মীদের একাংশকে একাধিকবার সতর্ক করেছেন শমীক। এ বারও তাঁর বক্তব্যে সেই উদ্বেগ স্পষ্ট। অভিযোগ, দলের কিছু নেতা-কর্মী সংগঠনের কাজে মন দেওয়ার বদলে সরকারি দফতরে গিয়ে টেন্ডার ও ঠিকাদারির কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
শিলিগুড়ির সাংগঠনিক বৈঠকে এই প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করেছেন রাজ্য সভাপতি। দলীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না—এমনই বার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, ক্ষমতায় আসার অর্থ সরকারি কাজের সুযোগকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা নয়। দলের সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের জন্য কাজ করাই নেতা-কর্মীদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে আদি ও নব্য বিজেপি নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
আদি-নব্য দ্বন্দ্বেও বাড়ছে অস্বস্তি
বাংলায় বিজেপির সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনীতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছে। সেই সময়ের পুরনো কর্মীদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অন্য দল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের নিয়েও সংগঠন বিস্তৃত হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর এই দুই অংশের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শমীকের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার কথাও উঠে এসেছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে বিজেপি বিরোধী রাজনীতি করেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে দলে বহু নতুন কর্মী যোগ দিয়েছেন। তাঁদের একাংশের পক্ষে নতুন সংগঠনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই সমস্যা সময়ের সঙ্গে মিটে যাবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও নতুন মাত্রা পেতে পারে। কে কতটা সাংগঠনিক গুরুত্ব পাবেন, কার হাতে কোন দায়িত্ব থাকবে এবং প্রশাসনিক স্তরে কার প্রভাব কতটা—এমন নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিজেপির ক্ষেত্রে এই সমীকরণ সামলানো এখন নেতৃত্বের কাছে বড় কাজ।
শুধু সতর্কবার্তা, না কি কড়া শাস্তি?
দলের অভ্যন্তরে বিচ্যুতি রুখতে কী ধরনের পদক্ষেপ করা হবে, তা নিয়ে এখনই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানাননি শমীক। তবে শো-কজ থেকে সাসপেনশন, এমনকি বহিষ্কারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। ফলে অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দল কতটা কঠোর হয়, এখন নজর সেদিকেই।
শুধু প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দেওয়াই যথেষ্ট হবে, না কি অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। বিশেষত, টেন্ডার-ঠিকাদারি ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে দলীয় তদন্ত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে কী সমন্বয় তৈরি হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি নেতৃত্বের সামনে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব—একদিকে সরকারের কাজের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা, অন্যদিকে সংগঠনের ভিতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। শমীকের বক্তব্য সেই চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন।
মমতাকে কটাক্ষ শমীকের
দলের সাংগঠনিক সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নিশানা করেছেন শমীক। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর পদে না থাকার বিষয়টি মমতা এখনও মেনে নিতে পারছেন না। রাজ্যে গত পাঁচ মাসে ৬০০ খুন এবং ২৪৫৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে মমতা যে দাবি করছেন, তা নিয়েও কটাক্ষ করেছেন তিনি। মমতার বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি।