সিঙ্গাপুর: বিমানের টিকিট কেটেছেন, অথচ আপনার নাম, ফোন নম্বর, যাত্রার বিবরণ কিংবা পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে গিয়েছে সাইবার অপরাধীদের হাতে! আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা ক্ষেত্রে বড়সড় তথ্য ফাঁসের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়াল। এ বার সাইবার হানার শিকার সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। সংস্থার প্রায় ৪৬ হাজার বুকিংয়ের তথ্য অননুমোদিত ভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিমান সংস্থা। ঘটনার সূত্র স্পেনের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা অ্যামাডিউসের (Amadeus) বুকিং প্রযুক্তি ব্যবস্থা। এর আগে ক্যাথে প্যাসিফিক, জাপান এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক বিমান সংস্থার গ্রাহকদের তথ্যও এই একই ঘটনার জেরে ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের তরফে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় যাত্রীদের নাম, বুকিং রেফারেন্স নম্বর, যাত্রাপথের বিবরণ এবং টিকিটের শ্রেণি সংক্রান্ত তথ্য অননুমোদিত ভাবে দেখা হয়েছে। প্রায় ৬২০টি বুকিংয়ের ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সেই তালিকায় রয়েছে যাত্রীদের ই-মেল ঠিকানা, ফোন নম্বর, ভ্রমণ সংক্রান্ত নথির বিবরণ এবং সংস্থার জনপ্রিয় ‘ক্রিসফ্লায়ার’ (KrisFlyer) সদস্যপদের নম্বর। তবে বিমান সংস্থার দাবি, গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের কোনও তথ্য ফাঁস হয়নি। এমনকি যাত্রীদের বুকিংয়েও কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় কোনও সাইবার হানা হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছে সংস্থা। তাদের দাবি, সমস্যাটি সীমাবদ্ধ ছিল অ্যামাডিউসের প্ল্যাটফর্মে।
কী ভাবে ঘটল তথ্য ফাঁস?
বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থা টিকিট বুকিং, সংরক্ষণ এবং যাত্রা সংক্রান্ত তথ্য পরিচালনার জন্য অ্যামাডিউসের মতো প্রযুক্তি সংস্থার পরিষেবা ব্যবহার করে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সেরও বুকিং এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি অংশ এই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। সংস্থাটির দাবি, অ্যামাডিউসের বুকিং প্রদর্শন ব্যবস্থায় একটি নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনও পক্ষ গ্রাহকদের তথ্যের নাগাল পেয়েছিল। অ্যামাডিউস এই নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির কথা স্বীকার করেছে। ঘটনার পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
তবে ঠিক কত জন গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি প্রযুক্তি সংস্থাটি। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, যাঁদের বুকিংয়ের তথ্য আক্রান্ত হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁদের আগামী দিনে বিমানযাত্রা রয়েছে, তাঁদের বুকিং রেফারেন্স নম্বর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত গ্রাহকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে বিমান সংস্থা।
একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা আক্রান্ত
এই ঘটনার জেরে শুধু সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স নয়, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ শিল্পের একাধিক পরিচিত সংস্থার গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৫৩ হাজার বুকিংয়ের তথ্য এই নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির কারণে আক্রান্ত হয়েছে। অন্য দিকে, জাপান এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৯২ হাজার গ্রাহকের তথ্যের নাগাল পেয়েছিল অননুমোদিত পক্ষ।
জাপানের অল নিপ্পন এয়ারওয়েজের (এএনএ) প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০ যাত্রীর তথ্যও আক্রান্ত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। এ ছাড়াও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এয়ার এবং আসিয়ানা এয়ারলাইন্সের গ্রাহকদের তথ্য এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, একটি প্রযুক্তি সংস্থার নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা কী ভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থার যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাঙ্কের তথ্য কিংবা ক্রেডিট কার্ডের নম্বর চুরি না হলেও যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া যথেষ্ট বিপজ্জনক। কারণ বুকিং নম্বর, যাত্রার তারিখ, গন্তব্য, ফোন নম্বর এবং ই-মেল ঠিকানা হাতে পেলে সাইবার অপরাধীরা নির্দিষ্ট যাত্রীকে নিশানা করে প্রতারণার জাল তৈরি করতে পারে। যেমন, কোনও যাত্রীকে তাঁর আসন্ন বিমানযাত্রা বাতিল হওয়ার ভুয়ো বার্তা পাঠিয়ে টাকা চাওয়া হতে পারে। আবার বিমান সংস্থার পরিচয় দিয়ে ফোন করে বুকিং সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের নামে পাসপোর্টের বিবরণ, ব্যাঙ্কের তথ্য কিংবা ওটিপি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। ফলে আর্থিক তথ্য সরাসরি ফাঁস না হলেও পরবর্তী সময়ে ফিশিং ও পরিচয় জালিয়াতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তৃতীয় বড় তথ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা। ২০২১ সালে তাদের ক্রিসফ্লায়ার এবং পিপিএস সদস্যপদ কর্মসূচির প্রায় ৫ লক্ষ ৮০ হাজার সদস্যের তথ্য আক্রান্ত হয়েছিল। ২০২২ সালে সংস্থার অনলাইন বিপণন পরিষেবা ক্রিসশপেও ফিশিং হামলার ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে অ্যামাডিউসকে ঘিরে এই সাইবার নিরাপত্তা বিতর্ক আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ শিল্পের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কারণ এখন বিমানযাত্রার প্রায় প্রতিটি ধাপই প্রযুক্তিনির্ভর। টিকিট বুকিং থেকে শুরু করে যাত্রীর পরিচয় যাচাই—সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তায় সামান্য ফাঁকও যে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বসে থাকা যাত্রীর ব্যক্তিগত তথ্যকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ঘটনা ফের তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।




