স্পোর্টস ডেস্ক: ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে নেতৃত্ব বদলের পরেই প্রকাশ্যে এল অন্দরমহলের অস্বস্তির ছবি। বেশ কিছু দিন ধরেই নাকি মতের মিল হচ্ছিল না স্মৃতি মান্ধানা এবং হরমনপ্রীত কৌরের মধ্যে। তার প্রভাব পড়েছিল দলের ড্রেসিংরুমেও। এক নামী সংবাদ সংস্থার দাবি, দু’জনের সম্পর্ক একসময় বেশ ভাল থাকলেও নেতৃত্বের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। এশিয়ান গেমসে ভারতকে টানা দ্বিতীয় সোনা এনে দেওয়ার পর হরমনপ্রীত নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার পর প্রত্যাশিতভাবেই তিন ফরম্যাটে ভারতীয় দলের ব্যাটন উঠেছে ৩০ বছরের মান্ধানার কাঁধে। কিন্তু এই বদলের নেপথ্যে যে দীর্ঘ দিনের টানাপোড়েন ছিল, তা-ই এখন সামনে আসছে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজারের বেশি রান করে ফেলেছেন মান্ধানা, এবং এই মুহূর্তে তিনি দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার। ফলে তাঁর হাতে নেতৃত্ব যাওয়াকে অনেকেই সময়ের দাবি বলে মনে করছেন।
স্মৃতির নেতৃত্ব পাওয়ার ঘটনা অবশ্য একেবারে আচমকা নয়। গত বছর ঘরের মাঠে ভারত মহিলা দল একদিনের বিশ্বকাপ জিতে দীর্ঘ দিনের আইসিসি ট্রফির খরা কাটালেও তার পরেও নেতৃত্বে কোনও বদল আনেনি নির্বাচক কমিটি। সেই সিদ্ধান্তে মান্ধানা যে খুব একটা খুশি ছিলেন না, তা তাঁর সাম্প্রতিক কথাবার্তাতেই স্পষ্ট হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত। এশিয়ান গেমসে সোনা জেতার পরও তাঁর বক্তব্য ছিল, ছোট-বড় সব প্রতিযোগিতাতেই ভারতের লক্ষ্য আরও বড় হওয়া উচিত। অন্যদিকে পর পর দু’টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত দ্রুত ছিটকে যাওয়ার পর থেকেই হরমনপ্রীতের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত গুয়াহাটিতে বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়ার নেতৃত্বে হওয়া পর্যালোচনা বৈঠকে হরমনপ্রীতকে নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়। তার পরেই তিনি নিজে নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক দলীয় সূত্রের দাবি, "ওঁরা বেশ কিছু দিন ধরেই একমত হচ্ছিলেন না। তার ফলে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ড্রেসিংরুমে।"
এর আগে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের কিংবদন্তি মিতালি রাজও বলেছিলেন, মান্ধানাকে অন্তত দুই-তিন বছর আগেই নেতৃত্ব দেওয়া উচিত ছিল। ইংল্যান্ডে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ের পর মিতালির বক্তব্য ছিল, মান্ধানা একদিনের ক্রিকেট এবং টেস্টে নেতৃত্ব দিতে পারেন। টি-টোয়েন্টির দায়িত্ব তুলনামূলক ভাবে তরুণ কারও হাতে দেওয়া যেতে পারে, যেমন শেফালি বর্মা। মহিলা ক্রিকেটে পুরুষ দলের মতো সব সময় তীব্র চাপ না থাকলেও নেতৃত্ব বদলের ক্ষেত্রে ভারতীয় নির্বাচকদের ভুল নতুন নয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের পর মিতালির কাছ থেকে একদিনের দলের নেতৃত্ব হরমনপ্রীতের হাতে যাওয়ার সময়ও দুই তারকা ক্রিকেটারের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল বলে দাবি করা হয়। সেই সময় দলের মধ্যে গোষ্ঠী বিভাজনের অভিযোগও উঠেছিল। এ বার পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ হরমনপ্রীত নেতৃত্ব ছাড়লেও আগামী ২-৩ বছর ক্রিকেটার হিসেবে খেলা চালিয়ে যেতে চান। ফলে মান্ধানার অধীনে একই দলে তাঁদের একসঙ্গে খেলার বিষয়টি এখন বিশেষ নজরে।
এশিয়া কাপ এবং এশিয়ান গেমসে ভারত দাপট দেখালেও হরমনপ্রীতের ব্যক্তিগত ফর্ম খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। নেতৃত্বের চাপ না থাকায় এখন তাঁকে শুধুই ব্যাটার হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াই করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশার চাপ বাড়বে। অন্য দিকে, স্মৃতি মান্ধানার হাতে নেতৃত্ব আসায় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। উক্ত সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতৃত্বের প্রশ্নে দুই তারকার মধ্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা এখন অতীত করে দলের স্বার্থে একসঙ্গে এগোতে পারবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। হরমনপ্রীত যদি নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেন এবং মান্ধানা নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও ধারাবাহিক থাকেন, তা হলে ভারতের মহিলা ক্রিকেট নতুন অধ্যায়ে ঢুকতে পারে। কিন্তু পুরনো ক্ষত যদি ড্রেসিংরুমে থেকে যায়, তা হলে নতুন ক্যাপ্টেনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মাঠের বাইরের সেই দূরত্ব মুছে ফেলা।
