নিউজ ডেস্ক: বারবার খেলার ধরন বদলেছে। কখনও জুডো, কখনও কুরাশ, কখনও জু-জিৎসু। প্রতিটি খেলায় নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, জিতেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদকও। কিন্তু এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছিল। বয়স ৩৬ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সেই স্বপ্নকে বিসর্জন দেননি সুচিকা তারিয়াল। শেষ পর্যন্ত মিক্সড মার্শাল আর্টস বা এমএমএ-তে ভারতের হয়ে এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জিতে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি পদক জয়ের গল্প নয়, বরং বার বার বাধা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অসাধারণ কাহিনি।
বয়স একটা সংখ্যাই, জেদই আসল
‘‘দেরিতে পেয়েছি, কিন্তু পেয়েছি। আমি খুব খুশি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটা করতে পেরেছি। তবে আমার মনে হচ্ছে, আরও অনেক কিছু করা বাকি।’’ এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের পর এমনই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন সুচিকা। তবে ব্রোঞ্জ জিতেও তাঁর মনে আক্ষেপ থেকে গিয়েছে। কারণ, লক্ষ্য ছিল সোনা। সেমিফাইনালে সিঙ্গাপুরের হুই হুন তেও-র বিরুদ্ধে লড়াই নির্ধারিত সময়ে অমীমাংসিত থাকার পরে অতিরিক্ত রাউন্ডেও নিষ্পত্তি হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিযোগীর সকালের ওজনের ভিত্তিতে বিজয়ী নির্ধারিত হয়। সুচিকার চেয়ে প্রায় ৭০০ গ্রাম কম ওজন হওয়ায় ফাইনালে ওঠেন সিঙ্গাপুরের প্রতিযোগী। ফলে সোনার লড়াইয়ে নামার সুযোগ হারান ভারতীয় খেলোয়াড়। তবে সেই হতাশার মধ্যেও সুচিকার ব্রোঞ্জের গুরুত্ব কম নয়। এশিয়ান গেমসে এমএমএ-তে ভারতের প্রথম পদক এনে দিয়েছেন তিনি। যে খেলায় নামার সময় তাঁকে বয়সের কথা শুনতে হয়েছে, সেই খেলাতেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই লড়াই শেখার শুরু
সুচিকার লড়াইয়ের গল্প শুরু পদকের স্বপ্ন নিয়ে নয়, বরং নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজন থেকে। দিল্লির কাছে ছাওলা এলাকায় বড় হওয়া সুচিকা যখন প্রায় ১২ বছরের কিশোরী, তখন একটি সেলুনে এক নাপিতের অশালীন আচরণের শিকার হন। ঘটনাটি তাঁকে মানসিক ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারেননি। বাইরে বেরোতেও ভয় লাগত। পরে মনে হয়েছিল, নিজের আত্মরক্ষার জন্য লড়াই শেখা দরকার।
সুচিকার কথায়, ‘ওই ব্যক্তি আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছিলেন। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। কী ঘটছে, কেন ঘটছে, কিছুই বুঝতে পারিনি।’ সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখার দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর মা তাঁকে জুডো প্রশিক্ষণে ভর্তি করিয়ে দেন। শুরুতে বক্সিং শেখার ইচ্ছা থাকলেও জুডোর প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন সুচিকা। পড়াশোনা কিংবা অন্য কিছু নয়, তাঁর মন পড়ে থাকত অনুশীলনের মাঠেই।
এর পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জুডোয় আট বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ২০১৮ সালের কমনওয়েলথ জুডো প্রতিযোগিতায় রুপো এবং ২০১৯ সালে সোনা জেতেন। একই বছরে দক্ষিণ এশীয় গেমসেও সোনা পান। কিন্তু এত সাফল্যের পরেও এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিক্সে পদক জয়ের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছিল না।
এক খেলা থেকে অন্য খেলায়, তবুও থামেননি
জুডোয় আন্তর্জাতিক সুযোগ ও যোগ্যতা অর্জনের পথে বাধা আসায় সুচিকা কুরাশে চলে যান। প্রায় এক বছর অনুশীলনের পর ২০২৩ সালের এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নাম নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে অংশগ্রহণের অনুমতি মিললেও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় পাননি। হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে কুরাশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পদক জিততে পারেননি।
তার পর জু-জিৎসুতে মন দেন সুচিকা। ২০২৪ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাফল্যও আসে। কিন্তু এই খেলায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ এবং ভারতে খেলাটির স্বীকৃতি নিয়ে সমস্যা ছিল। ফলে নতুন করে পথ খুঁজতে হয় তাঁকে। ২০২৫ সালে এমএমএ-তে আসার প্রস্তাব পেয়ে সেই খেলায় যোগ দেন। জুডো ও জু-জিৎসুর অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিয়েছিল। তবে ঘুষি, লাথি এবং বক্সিংয়ের কৌশল আরও ভালো করার জন্য নতুন করে অনুশীলন করতে হয়েছে।
পাশে পেয়েছেন স্বামীকে
এই দীর্ঘ যাত্রায় স্বামী কপিল হুডার পাশে পেয়েছেন সুচিকা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁদের প্রতিদিনের লড়াই। সুচিকা যে জিমে অনুশীলন করেন, সেটি নামী তারকা বিকাশ দাহিয়ার। একতলা সেই জিমে রয়েছে একটি সাধারণ ম্যাট, খাঁচা এবং অনুশীলনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। বিকাশ বাইরে থাকলে জিমের চাবি থাকে সুচিকা ও তাঁর স্বামীর কাছে। সেই ছোট্ট জায়গা থেকেই আন্তর্জাতিক পদকের প্রস্তুতি নিয়েছেন তাঁরা।
সুচিকার লক্ষ্য এখন আগামী বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ের পরেও তাঁর মনে রয়েছে সোনা না পাওয়ার আক্ষেপ। কিন্তু যে বয়সে অনেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবেন, সেই বয়সে নতুন খেলায় নেমে দেশের হয়ে পদক জেতা নিজেই বড়ো সাফল্য। সুচিকার কাহিনি তাই মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন পূরণে দেরি হতে পারে, পথও বদলাতে পারে—কিন্তু চেষ্টা থামিয়ে না দিলে নতুন দরজা খুলতেই পারে।





