নিউজ ডেস্ক: দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে কি স্থানীয় নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যাবে না? জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই নিয়মের ভবিষ্যৎ নিয়েই এবার বড় প্রশ্ন তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা পরিস্থিতি এবং ক্রমশ কমতে থাকা জন্মহারের পরিসংখ্যান সামনে রেখে দুই সন্তান নীতির প্রাসঙ্গিকতা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বলে মনে করছে শীর্ষ আদালত। শুধু তাই নয়, ২০০৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় খতিয়ে দেখতে মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পঞ্চায়েত কিংবা পুরসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে দুই সন্তানের বেশি থাকলে অযোগ্য ঘোষণার বিধান রয়েছে। মূলত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দিতেই এই নিয়ম চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের জনসংখ্যার চিত্র অনেকটাই বদলেছে। সেই পরিস্থিতিতে পুরনো আইন এখনও কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট।
কেন নতুন করে আলোচনায় দুই সন্তান নীতি?
বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ২০০৩ সালে যখন দুই সন্তান নীতির সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখা হয়েছিল, তখন দেশের মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট ছিল ৩। বর্তমানে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯-এ। অর্থাৎ জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১ প্রতিস্থাপন হারেরও নিচে নেমে গিয়েছে ভারতের জন্মহার।
আদালতের মতে, এই পরিস্থিতিতে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে কাউকে স্থানীয় নির্বাচনে লড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার আইন তার পুরনো উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলতে পারে। আগামী দিনে দেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা বাড়া এবং কর্মক্ষম যুবসমাজের অনুপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
২০০৩ সালের রায় কি এবার বদলাবে?
২০০৩ সালে 'জাভেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্য' মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ হরিয়ানা পঞ্চায়েতি রাজ আইনের দুই সন্তান নীতিকে সাংবিধানিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবার সেই রায়ের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে।
বিচারপতি নরসিংহের পর্যবেক্ষণ, দুইয়ের বেশি সন্তান থাকার কারণে কাউকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যুক্তিযুক্ত নয়। এই ধরনের বিধান একজন নাগরিককে সন্তান ধারণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করে। যা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে স্বীকৃত প্রজনন স্বাধীনতার প্রশ্নও তুলে দেয়।
মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন সরপঞ্চ পেলেন স্বস্তি
এই মামলার সূত্রেই মহারাষ্ট্রের কাকোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সরপঞ্চ মঙ্গলা ভীমরাওয়ের অযোগ্যতার নির্দেশ খারিজ করেছে শীর্ষ আদালত। তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়ায় মহারাষ্ট্র ভিলেজ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী তাঁকে পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। বম্বে হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিল। কিন্তু এবার হাইকোর্টের নির্দেশ বাতিল করে মঙ্গলার পক্ষে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
কোন কোন রাজ্যে এখনও চালু এই নিয়ম?
আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, অসম, গোয়া, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ড—এই ছয়টি রাজ্যে এখনও দুই সন্তান নীতি কার্যকর রয়েছে। সাতটি রাজ্য আগে এই বিধান চালু করলেও পরে তা বাতিল করেছে। অন্যদিকে, ১৫টি রাজ্যে এমন কোনও বিধান নেই।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখনই দুই সন্তান নীতি দেশজুড়ে বাতিল হয়ে যাচ্ছে, এমনটা নয়। বৃহত্তর বেঞ্চের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর। সেই রায়ই আগামী দিনে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নাগরিকের প্রজনন স্বাধীনতা নিয়ে আইনি অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।




