নিউজ ডেস্ক: সময় মাপার নির্ভুলতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন একটি পারমাণবিক ঘড়ি তৈরি করেছেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। এই গবেষণার গুরুত্ব হল, ভবিষ্যতে আরও নির্ভুলভাবে সময় পরিমাপের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গবেষকদের পরীক্ষায় ঘড়িটির কম্পাঙ্কের স্থিতিশীলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার সঙ্গে ৩০০ লক্ষ বছরে প্রায় এক সেকেন্ডের সময়গত ত্রুটির তুলনা করা যায়। তবে এটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল অপটিক্যাল পারমাণবিক ঘড়িগুলির সমকক্ষ নয়। থোরিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে সময়ের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা এই ঘড়ি নিজে থেকেই লেজারের কম্পাঙ্কের পরিবর্তন সংশোধন করতে পারে।
পারমাণবিক ঘড়িতে নির্দিষ্ট পরমাণুর শক্তিস্তরের মধ্যে পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে সময়ের হিসাব রাখা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ ঘড়িতে সময় মাপার জন্য দোলন বা নিয়মিত পুনরাবৃত্তির সাহায্য নেওয়া হয়। নতুন এই ঘড়িতে গবেষকেরা সরাসরি নিউক্লিয়াসের শক্তিস্তরের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়েছেন। এর জন্য তাঁরা ব্যবহার করেছেন থোরিয়াম-২২৯, যার নিউক্লিয়াসের দুটি শক্তিস্তরের মধ্যে ব্যবধান অন্য অধিকাংশ নিউক্লিয়াসের তুলনায় অত্যন্ত কম। সেই কারণেই উপযুক্ত কম্পাঙ্কের লেজার আলো ব্যবহার করে নিউক্লিয়াসকে এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়িতে সাধারণত পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে থাকা ইলেকট্রনের শক্তিস্তরের পরিবর্তন কাজে লাগানো হয়।
তাপমাত্রার পরিবর্তন বা অন্য কোনও কারণে লেজারের কম্পাঙ্ক সামান্য বদলে যেতে পারে। ফলে সময় মাপার নির্ভুলতাও কমে যায়। এই সমস্যা সামলাতে গবেষকেরা থোরিয়াম নিউক্লিয়াসের আলো শোষণের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেছেন। লেজারের কম্পাঙ্ক সঠিক অবস্থান থেকে সরে গেলে থোরিয়াম নিউক্লিয়াসের আলো শোষণের পরিমাণ কমে যায়। যন্ত্রটি সেই পরিবর্তন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজারের কম্পাঙ্ক সংশোধন করে। এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ফলে বাইরের কোনও প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়ির সাহায্য ছাড়াই নতুন ঘড়িটি নিজের লেজারকে স্থিতিশীল রাখতে পারে। এটাই এই ঘড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পরীক্ষায় ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইডের একটি স্ফটিকের মধ্যে থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়াস স্থাপন করে সেটিকে লেজারের আলো দিয়ে উত্তেজিত করা হয়। এরপর নিউক্লিয়াসের আলো শোষণের পরিবর্তন পরিমাপ করেন গবেষকেরা। প্রায় ২৩ ঘণ্টার পরিমাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা ঘড়িটির ভগ্নাংশীয় কম্পাঙ্কের অস্থিরতা (10^{-15}) মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছতে দেখেছেন। এই মানের সঙ্গে ৩০০ লক্ষ বছরে প্রায় এক সেকেন্ডের সময়গত ত্রুটির তুলনা করা যায়। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি ঘড়িটির নির্ভুলতার একটি আনুমানিক তুলনা; ৩০০ লক্ষ বছর ধরে চালিয়ে দেখা কোনও পরীক্ষার ফলাফল নয়। গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, যন্ত্রটি প্রায় এক দিন মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাজ করতে পেরেছে।
নিউক্লিয়াসকে সময় মাপার কাজে ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা হল, পরমাণুর বাইরের ইলেকট্রনের তুলনায় নিউক্লিয়াস বাইরের তড়িৎচুম্বকীয় প্রভাবের প্রতি অনেক কম সংবেদনশীল। পরমাণুর তুলনায় নিউক্লিয়াসের আকারও প্রায় ১০ হাজার গুণেরও বেশি ছোট। এই বৈশিষ্ট্যগুলি কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভুল ঘড়ি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এমন ঘড়ি উন্নত নৌচালনা ও অবস্থান নির্ণয়, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সময়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য পরিমাপ এবং পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধ্রুবকগুলির পরিবর্তন অনুসন্ধানের কাজে সহায়ক হতে পারে। থোরিয়াম-২২৯-এর শক্তিস্তরের পরিবর্তন কিছু তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী অতি হালকা অন্ধকার পদার্থের প্রভাব অনুসন্ধানেও বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তির গবেষণা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। বিশ্বের সেরা অপটিক্যাল পারমাণবিক ঘড়িগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে এর কার্যক্ষমতা আরও উন্নত করতে হবে। গবেষকেরা আরও উন্নত লেজার, উন্নত মানের থোরিয়াম স্ফটিক এবং কার্যকর পরিমাপব্যবস্থা ব্যবহার করে ঘড়িটির অস্থিরতা কমানোর পরিকল্পনা করছেন। অর্থাৎ, এই গবেষণার মূল সাফল্য শুধু অত্যন্ত নির্ভুল সময় মাপা নয়, বরং নিউক্লিয়াসের শক্তিস্তরকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি ঘড়ি তৈরির পথে এগিয়ে যাওয়া, যা নিজের সময়ের মানদণ্ডকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারে।
