মুম্বই: বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু পরিকল্পনা করে হামলা চালানোই নয়, পুলিশের তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে, তা-ও নাকি নিয়মিত জানতে পারছিল অভিযুক্তেরা। টেলিভিশনের খবরের উপর নজর রেখে এক রহস্যময় ব্যক্তি ফোন ও মেসেজের মাধ্যমে হামলাকারীদের সতর্ক করছিলেন বলে সন্দেহ মুম্বই পুলিশের। ফলে তদন্তকারীদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, পুলিশের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম খবর পাচ্ছিল কারা? আর সেই তথ্যই বা পৌঁছে দিচ্ছিল কে?
১৮ অক্টোবর মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় ফুটবল খেলে ফেরার সময় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তিন যুবকের বিরুদ্ধে। অভিনেতা অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পেলেও তাঁর গাড়ির চালক এবং এক ভিডিয়ো নির্মাতা আহত হন। ঘটনার পর মোটরবাইকে চেপে পালিয়ে যায় অভিযুক্তেরা। পরে রাজস্থানের কোটা থেকে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের নাম রেহান রহিসুদ্দিন আনসারি (১৮), ফুল সিং (১৮) এবং ঋত্বিক মাহাতো (২২)।
টিভিতে মুখ দেখাতেই সতর্কবার্তা!
তদন্তকারীদের দাবি, হামলার পর পালিয়ে বেড়ানোর সময় অভিযুক্তদের কাছে টেলিভিশনের খবরের ভিত্তিতে একের পর এক তথ্য পৌঁছচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি ও ভিডিয়ো দেখানো শুরু হলে রেহান আনসারির কাছে একটি সতর্কবার্তা আসে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। বার্তার বক্তব্য ছিল, ‘তোমাদের মুখ প্রকাশ্যে চলে এসেছে, সেখান থেকে পালাও।’
এই তথ্য সামনে আসার পর তদন্তকারীদের সন্দেহ, হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কোনও ব্যক্তি টেলিভিশনের খবর নিয়মিত দেখছিলেন এবং পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁদের সতর্ক করছিলেন। তবে ওই ব্যক্তি কে, তিনি সরাসরি অভিযুক্তদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, কিংবা অন্য কারও মাধ্যমে খবর পৌঁছে দিতেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ইন্টারনেট কল, গোপন যোগাযোগের খোঁজ
পুলিশের নজরে এসেছে, হামলার আগে ও পরে রেহান এক ব্যক্তির সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করছিলেন। তদন্তকারীদের অনুমান, সাধারণ মোবাইল কলের পরিবর্তে ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা কল কিংবা মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। সিগন্যাল বা জাঙ্গির মতো অ্যাপ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ঠিক কোন অ্যাপ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পুলিশের দাবি, হামলার আগে এবং পালানোর সময় রেহানের ফোনে যোগাযোগের একাধিক সূত্র মিলেছে। সেই কলের রেকর্ড, উদ্ধার হওয়া মোবাইল এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করে যোগাযোগের জাল খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, হামলার পরিকল্পনা কে করেছিল, কে নির্দেশ দিয়েছিল এবং হামলাকারীদের গতিবিধি সম্পর্কে কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছিল।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগ?
এই ঘটনায় কুখ্যাত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সম্ভাব্য যোগ নিয়েও তদন্ত চলছে। অনিল পণ্ডিত নামে এক ব্যক্তি সমাজমাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করে পোস্ট করেছিলেন বলে খবর। তবে সেই দাবির সত্যতা এখনও স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, অনিল পণ্ডিত কিংবা গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত অন্য কেউ হামলাকারীদের পরিচালনা করছিলেন কি না।
পুলিশের সন্দেহ, হামলাকারীদের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্দেশদাতাদের যোগাযোগের সূত্রেই হামলার আগে ও পরে বিভিন্ন তথ্য আদানপ্রদান হয়েছিল। তবে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল প্রমাণ এবং অভিযুক্তদের বয়ান মিলিয়ে দেখছে।
আগেও কি হামলার চেষ্টা হয়েছিল?
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অভিযুক্তেরা ১১ অক্টোবরও জুহুর ওই ফুটবল মাঠের আশপাশে গিয়েছিলেন বলে সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের তথ্য থেকে পুলিশের ধারণা। সে দিন টাইগার মাঠে না আসায় তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ১৮ অক্টোবর তাঁরা ফের ওই এলাকায় পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পুলিশের অনুমান, অভিনেতার নিয়মিত ফুটবল খেলার সময়সূচি সম্পর্কে অভিযুক্তদের ধারণা ছিল। সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য কিংবা অন্য কোনও সূত্র থেকে তাঁরা সেই খবর পেয়েছিলেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলার পর অভিযুক্তেরা ফোন বন্ধ করে বিভিন্ন যানবাহন বদলে পালানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গাড়ির চালককে ফোন করার সূত্র ধরে তাঁদের যাত্রাপথের খোঁজ পায় পুলিশ। সেই সূত্র ধরে রাজস্থানের কোটায় তাঁদের গ্রেফতার করা হয়।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। অভিযুক্তদের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্দেশদাতাদের যোগাযোগ, হামলার উদ্দেশ্য এবং বলিউডের অন্য কোনও ব্যক্তিও নিশানায় ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
টাইগার শ্রফের উপর হামলার তদন্তে এখন তাই শুধু গুলি চালানো তিন যুবককে ঘিরেই প্রশ্ন সীমাবদ্ধ নেই। পুলিশের তদন্তের খবর আগাম জেনে তাঁদের সতর্ক করছিল কে, আর সেই যোগাযোগের পিছনে আরও বড় কোনও চক্র রয়েছে কি না—সেই রহস্যের সমাধানেই নজর তদন্তকারীদের।




