ওয়াশিংটন: যুদ্ধ থামবে, না কি ফের জ্বলবে পশ্চিম এশিয়া? ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান নিয়ে যখন কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখনই নতুন করে সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, তেহরান সমঝোতায় না এলে ইরানের উপর ফের আঘাত হানতে পারে ওয়াশিংটন। সম্ভাব্য সেই অভিযানের নামও দিয়েছেন তিনি—‘আরও একটি ছোট এপিক ফিউরি’। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানও। আমেরিকা ও ইজরয়েল নতুন করে হামলা চালালে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এমনকি পারস্য উপসাগরের নীচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তারেও আঘাত হানার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।
শুক্রবার ফ্লরিডায় রিপাবলিকান দলের এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান সমঝোতায় রাজি না হলে ফের সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। তাঁর কথায়, “আমরা আরও একটি ছোট এপিক ফিউরি চালাতে পারি, অথবা ওরা সমঝোতায় আসতে পারে।” একই সঙ্গে ইরানকে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, তেহরান যদি বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে ঠিক কী শর্ত মানলে ইরানকে নতুন করে হামলার মুখে পড়তে হবে না, তা স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। কূটনৈতিক আলোচনা চলছে কি না, কিংবা নতুন অভিযানের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানাননি তিনি।
‘এই সপ্তাহান্তেই হামলা?’ জল্পনা বাড়াল মার্কিন দূতের মন্তব্য
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির আগে আমেরিকার তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাকের একটি মন্তব্য ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তাঁর ইঙ্গিত, ইরানের উপর নতুন করে হামলা এই সপ্তাহান্তেই হতে পারে। এক পডকাস্টে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, চলতি সপ্তাহান্তে ইরানে হামলার সম্ভাবনা রয়েছে কি না। উত্তরে ব্যারাক বলেন, “অবশ্যই, তা হতে পারে।” তবে ইরান নীতি নির্ধারণে ব্যারাকের সরাসরি ভূমিকা নেই।
তিনি সিরিয়া সংক্রান্ত বিষয়ে আমেরিকার অন্যতম প্রতিনিধি। তাঁর মন্তব্যের পর ট্রাম্পকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ওই রাষ্ট্রদূত এমন কথা বলেছেন কি না, তা তিনি জানেন না। মন্তব্যটি নিয়ে কার্যত বিস্ময় প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে নতুন হামলার কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। এক দিকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যে অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে।
‘আগুন নিয়ে খেলবেন না’, পাল্টা বার্তা ইরানের
আমেরিকার হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানও কড়া অবস্থান নিয়েছে। তেহরানের এক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইজরয়েল ফের হামলা চালালে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের পরিধি আরও বাড়তে পারে। সেই পদক্ষেপের লক্ষ্য হতে পারে পারস্য উপসাগরের নীচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তারও।
ওই আধিকারিকের হুঁশিয়ারি, ইরানের উপর আক্রমণ হলে সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলায় থাকা যোগাযোগ পরিকাঠামো—কোনও ক্ষেত্রেই আর আগের মতো সীমারেখা বজায় থাকবে না। আমেরিকাকে ‘আগুন নিয়ে না খেলার’ বার্তাও দিয়েছে তেহরান।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, সমুদ্রের তলায় থাকা যোগাযোগের তার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ ও তথ্য আদানপ্রদানেও প্রভাব পড়তে পারে। এই ধরনের পরিকাঠামোর উপর একাধিক দেশ ও সংস্থার নির্ভরতা রয়েছে। ফলে সামরিক সংঘাতের পরিধি বাড়লে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
তবে যোগাযোগের তারে হামলা চালানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা ইরানের এক আধিকারিকের বক্তব্যের ভিত্তিতে। এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে, এমন কোনও তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
‘মিডনাইট হ্যামার’ ও ‘এপিক ফিউরি’ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
বক্তৃতায় ট্রাম্প আগের সামরিক অভিযানের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছিল। পরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি ও অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরয়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ শুরু হয়েছিল। সেই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের কয়েক জন সদস্যের মৃত্যু হয় বলে খবর। তার পর থেকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপের প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁর বক্তব্য, আগের প্রশাসনগুলি এই বিপদ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেনি। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং তেহরানের পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ এখনও কাটেনি।
আমেরিকার আধিকারিকদের নিশানা করার ছক?
নতুন হামলার হুঁশিয়ারির মধ্যেই আমেরিকার গোয়েন্দা মহলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা দফতরের একটি গোপনীয় নয় এমন নথিতে আমেরিকার আধিকারিকদের লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কয়েকটি পরিকল্পনা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই নথিতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কোনও দেশের নাম কিংবা পরিকল্পনাগুলির প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এই হুমকির বাস্তব মাত্রা কতটা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সৌদি আরবের রিয়াধে মার্কিন দূতাবাস এবং জেড্ডা ও ধাহরানের কনস্যুলেট থেকে জরুরি নয় এমন কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। পরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, লেবানন, কাতার ও জর্ডনে মার্কিন দূতাবাসগুলিতেও কর্মীসংখ্যা কমানো হয় বলে খবর।
যুদ্ধের অবসান চান ট্রাম্প, কিন্তু কবে?
এক দিকে নতুন হামলার হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে যুদ্ধের অবসানের আশ্বাস—দুই ধরনের বার্তাই দিচ্ছেন ট্রাম্প। ফ্লরিডার এক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, সমঝোতার মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনও উপায়ে, যুদ্ধের অবসান তিনি শীঘ্রই দেখতে চান। কিন্তু কবে যুদ্ধ থামতে পারে, কিংবা শান্তিচুক্তির জন্য কী কী শর্ত প্রয়োজন, তা স্পষ্ট করেননি।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনও এই সংঘাতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপ মার্কিন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই অবস্থান নিয়ে ফের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি এখন দুই বিপরীত সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে—এক দিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা, অন্য দিকে নতুন সামরিক অভিযানের আশঙ্কা। ট্রাম্পের ‘আরও একটি এপিক ফিউরি’র হুঁশিয়ারি এবং তেহরানের ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না’ বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সমঝোতা না হলে সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এই মুহূর্তে নতুন হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য নেই।




