চেন্নাই: এক দিকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার রাহুলের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে মুখোমুখি হলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা তামিলাগা ভেত্রি কাজগমের (টিভিকে) প্রধান সি জোসেফ বিজয়। রবিবার আবার চেন্নাই মেট্রোর দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি অংশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মোদীর সঙ্গে তাঁর একসঙ্গে মেট্রো সফরের কথা। পরপর দু’দিনে জাতীয় রাজনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে বিজয়ের এই যোগাযোগকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর জোটের সমীকরণ সামলানো এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে বিজয়ের সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
শনিবার দুপুরে চেন্নাই বিমানবন্দরে পৌঁছন রাহুল। সেখান থেকে তিনি যান বিজয়ের নীলাঙ্করাইয়ের বাসভবনে। দুই নেতার মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকের পর রাহুলের ‘মানাভারগলিন কুরল’ বা ‘ছাত্রদের কণ্ঠ’ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষা, শিক্ষার খরচ, বেকারত্ব-সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পরে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করে রাতেই দিল্লি ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
তবে এই সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনের পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের ডিএমকে-কংগ্রেস সমীকরণ ছেড়ে কংগ্রেস বিজয়ের টিভিকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। নির্বাচনে টিভিকে ১০৮টি আসন পেয়েছিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন না থাকায় কংগ্রেস-সহ কয়েকটি দলের সমর্থনে সরকার গড়ে বিজয়। নতুন জোটের নাম ‘সেকুলার সোশ্যাল জাস্টিস ভিক্টরি অ্যালায়েন্স’। টিভিকে ও কংগ্রেসের এই সমঝোতা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজয়ের সঙ্গে রাহুলের বৈঠক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুই দলের মধ্যে জোট হলেও নেতৃত্বের প্রশ্নে দু’পক্ষের অবস্থান এক নয়। তামিলনাড়ুতে বিজয়ই জোট সরকারের প্রধান মুখ। অন্য দিকে, জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের নেতৃত্ব এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে রাহুল গান্ধীর সম্ভাবনা নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট। টিভিকের কয়েকটি মহল থেকে বিজয়কে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার দাবি উঠেছিল। কংগ্রেস নেতারা সেই ধারণার বিরোধিতা করেছেন। ফলে রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ এবং জাতীয় স্তরের নেতৃত্বের প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নতুন জোটের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাহুলের সঙ্গে বৈঠক ঘিরে প্রথম থেকেই কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। দিল্লিতে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে রাহুলের একাধিক বার আটক হওয়ার ঘটনায় বিজয় প্রকাশ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া না জানানোয় কংগ্রেসের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল। অন্য দিকে, বিজয়ের শিবিরও এই সাক্ষাৎকে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখাতে নারাজ ছিল। শেষ পর্যন্ত মধ্যাহ্নভোজের বৈঠক নিশ্চিত হওয়ায় নতুন জোটের দুই শরিকের মধ্যে দূরত্ব নিয়ে জল্পনা কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর পরেই রবিবার মোদীর সঙ্গে বিজয়ের মেট্রো সফর। চেন্নাই মেট্রোর দ্বিতীয় পর্যায়ের পুন্তমল্লি-ভাদাপালানি অংশের প্রায় ১৪.৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে পরিষেবা চালুর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের পরে পুন্তমল্লি থেকে পোরুরের দিকে মেট্রোয় সফর করার কথা মোদী ও বিজয়ের। প্রশাসনিক দিক থেকে এটি নগর পরিবহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকেও এই সফরের ছবি ও বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
তামিলনাড়ুতে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও সীমিত। সেই রাজ্যে জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যৌথ উপস্থিতি বিজেপির পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্য দিকে, বিরোধী জোটের অংশীদার হয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রশাসনিক কাজকর্মে সহযোগিতা বজায় রাখার বার্তা দিতে পারেন বিজয়। তবে একই সঙ্গে রাহুল ও মোদীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগকে দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের সমর্থন হিসেবে দেখার কারণ নেই। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করা যেমন তাঁর দায়িত্ব, তেমনই কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের রাজনৈতিক শর্তও তাঁকে সামলাতে হবে।
বিজয়ের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—নতুন জোটের ঐক্য ধরে রাখা। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে মাদুরান্থকম ও ধরাপুরম, দুই কেন্দ্রেই টিভিকে-নেতৃত্বাধীন জোটের জয় তাদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন ও শাসনের শক্তিতে পরিণত করাই এখন মূল লক্ষ্য। কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার এবং জাতীয় বিরোধী রাজনীতিতে টিভিকের ভূমিকা—সব দিকেই তাঁকে সতর্ক পদক্ষেপ করতে হবে।
এই আবহে রাহুলের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ এবং পরদিন মোদীর সঙ্গে মেট্রো সফর বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এক দিকে বিরোধী জোটের সঙ্গে সম্পর্ক, অন্য দিকে কেন্দ্রের সঙ্গে সরকারি কাজের সমন্বয়—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে চাইছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। এই কৌশল তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে কতটা জায়গা করে দেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে জোটের স্থায়িত্ব, প্রশাসনিক সাফল্য এবং তাঁর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা স্পষ্ট হয়, তার উপর।
