নিউজ ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্র ও বৃহত্তম গণতন্ত্র দুই ভূখণ্ডেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভোটাধিকার এবং নাগরিকত্বের সমীকরণ। ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া রুখতে ভারত বা ব্রাজিলের উদাহরণ টানছেন, ঠিক তখনই ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি প্রশাসনিক পরিচ্ছন্নতার মনে হলেও, দুই দেশের রাজনৈতিক ভাষ্য ও বাস্তব পদক্ষেপে উঠে আসছে এক অচেনা মিল।
ভারতে নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় হওয়া এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৪ শতাংশ। কমিশন জানিয়েছে, মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নাম এবং তথ্যের অসঙ্গতি সংশোধন করতেই এই বড় মাপের উদ্যোগ। কিন্তু বিষয়টি নিছক কারিগরি সংশোধনে আটকে থাকেনি। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব খোয়ানো নয়। তবে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে উল্টো সুর স্পষ্ট। লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিতাড়নের বার্তা দিয়েছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় ঘনীভূত হয়েছে। বিরোধী দলগুলি একে ‘ঘুরপথে এনআরসি’ কার্যকর করার চেষ্টা বলে কটাক্ষ করেছে, যদিও নির্বাচন কমিশন ও শাসক দল সেই অভিযোগ নস্যাৎ করেছে।
আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনায় ভারতের মতো কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নেই, ৫০টি রাজ্য নিজেদের মতো করে ভোটার তালিকা বজায় রাখে। সেখানে ভোটার নিবন্ধনে সাধারণত ব্যক্তিগত ঘোষণার ওপর ভরসা রাখা হয়। ট্রাম্পের দাবি, এর ফাঁকফলে বহু অ-নাগরিক ভোট দিচ্ছেন। ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ কংগ্রেসে আটকে থাকলেও সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাম্প প্রশাসন ‘সেভ’ নামক একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। মূলত অভিবাসীদের সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা মাপার এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল সিকিউরিটির তথ্য। ফলে রাজ্যগুলি চাইলে নিজেদের ভোটার তালিকার নাম মিলিয়ে দেখতে পারছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কর্তারাও অবৈধ ভোটারদের গ্রেফতার ও বিতাড়নের কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, যার সুর দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের বয়ানের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে দুই দেশের পদ্ধতি আলাদা। ভারতে বংশপরম্পরায় নাগরিকত্ব প্রমাণের নির্দিষ্ট তারিখ ও নথিপত্রের কঠোর শর্ত রয়েছে, অন্যদিকে আমেরিকায় রাজ্যভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে সব ভোটারের তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও, দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ভূগোলে ‘ভোটাধিকার রক্ষায় অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ’ এখন প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের উৎসবে ভোটারের পরিচয় যাচাইয়ের এই তৎপরতা শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা আনবে, নাকি প্রান্তিক নাগরিকদের জন্য অধিকার রক্ষার লড়াইকে আরও জটিল করে তুলবে উঠছে প্রশ্ন।
