নিউজ ডেস্ক: রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে ভারতের পাশাপাশি চিন ও তুরস্কের উপরও চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানালেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। Wall Street Journal-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির আয় কমাতে পারলে মস্কোর উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং তা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের পথে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পর ভারতের রুশ তেল আমদানি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জেলেনস্কির যুক্তি, রাশিয়ার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল জ্বালানি রফতানি। ভারত, চিন ও তুরস্কের মতো বড় ক্রেতারা যদি রুশ তেলের কেনাকাটা কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে, তাহলে মস্কোর রাজস্বে চাপ পড়বে। তাঁর মতে, এর ফলে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের অর্থনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হতে পারে।
এই মন্তব্যের সময়েই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’-এ সই করেছেন। নতুন আইনে রুশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচটি বৃহত্তম ক্রেতার উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে। ভারত ও চিন এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। তবে আইনটি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়নি; এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যদি যুদ্ধ কমানোর বিষয়ে রাজি না হন, তাহলে ট্রাম্প নতুন ক্ষমতাগুলি ব্যবহার করতে পারেন বলে তিনি আশা করছেন। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
তবে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির ছবিতেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ভারত রাশিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা জুলাইয়ের তুলনায় ১৬.৫ শতাংশ কম। সেপ্টেম্বরের প্রাথমিক তথ্যেও আরও পতনের ইঙ্গিত মিলেছে। তা সত্ত্বেও ওই সময়ে রাশিয়াই ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী ছিল।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের তেল আমদানি বেড়েছে। আগস্টে ইরাক থেকে ভারতের আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ১.৭১ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও অন্যান্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও সরবরাহের পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।
নয়াদিল্লির অবস্থান অবশ্য বরাবরই আলাদা। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের অপরিশোধিত তেল কেনার সিদ্ধান্ত মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নেওয়া হয়। নতুন মার্কিন আইনের পরও ভারত জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
ফলে জেলেনস্কির নতুন আহ্বান এবং আমেরিকার নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনের ফলে ভারতের সামনে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। একদিকে রাশিয়া ভারতের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের নতুন আইন রুশ জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই ভারতের রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমেছে এবং বিকল্প সরবরাহের দিকেও নজর বাড়ছে।
আগামী দিনে দিল্লি কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, এই চারটি বিষয় একসঙ্গে সামলায়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
