নিউজ ডেস্ক: পোল্যান্ডের ক্রাকভে বন্দুকবাজের হামলায় ছ’জনের মৃত্যু এবং ১৫ জন আহত হওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে। শনিবার বিকেলে শহরের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র মেন স্কোয়ারে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় ২৪ বছরের এক যুবক। কট্টর দক্ষিণপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী ওই যুবককে গুলি করে জখম করে পুলিশ। বর্তমানে সে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিজের পরিবারের বাড়িতে বোন এবং বাবা-মায়ের মৃত্যুর সঙ্গেও তার যোগ রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
হামলার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের অনেকের কাছেই গোটা ঘটনাটি যেন সিনেমার দৃশ্য বলে মনে হয়েছে। ব্রাসেলসের পর্যটক মারি-আঁজ কোলার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থেই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছিলাম। উড়ে আসা গুলির হাত থেকে কোনও রকমে লুকিয়ে পড়ি। দোকানের মেঝেতে শুয়ে ছিলাম, যেন কোনও পুলিশি সিনেমার দৃশ্য। চারদিকে শুধু গুলির শব্দ।’
ব্রিটেনের বাসিন্দা নিল থ্যাক্সটন জানিয়েছেন, প্রথমে তাঁরা গুলির শব্দকে বাজি ফাটার আওয়াজ ভেবেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা মাত্রই প্রধান চত্বর পেরিয়েছিলাম। গুলির শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম বাজি ফাটছে। তার পরেই মানুষজনকে দৌড়তে দেখি। একটি উপহারের দোকানে ঢুকে পড়ি। দোকানের কর্মীরা আমাদের পিছনের দিকে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন এবং আলো নিভিয়ে দেন।’
ব্রিটিশ পর্যটক অ্যান্ডি হিল বিবিসি-কে বলেন, ‘মনে হচ্ছিল সিনেমার কোনও দৃশ্য দেখছি। ঘটনাটা সত্যি বলে বিশ্বাস হচ্ছিল না। সেই মুহূর্তে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল—দৌড়ব, দাঁড়িয়ে থাকব, না কি কোথাও আশ্রয় নেব। আমি দরজার ভিতর দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে জানলার আড়ালে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে সহজ বলে মনে করেছিলাম।’
আমেরিকান পর্যটক মেরিলিন গ্রিন বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটেছে ভেবে খুব খারাপ লাগছে। শহরটা এত সুন্দর। আমি আগে কখনও পোল্যান্ডে আসিনি। আমার বাবা-মা পোল্যান্ডের মানুষ। ওয়ারশ ঘুরে খুব ভালো লেগেছিল। ক্রাকভে আসার জন্যও মুখিয়ে ছিলাম।’
গ্রিসের পর্যটক আলেকজান্দ্রোস মারোনিতিস জানান, হামলাকারীকে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলার সময় তাঁরা তাকে দেখেছিলেন। কিন্তু তার পর পাঁচ ঘণ্টা নিজেদের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি। তাঁর কথায়, ‘আমরা কিছুটা আতঙ্কিত। পোল্যান্ডে এই প্রথম এলাম। শুনেছিলাম দেশটি নিরাপদ।’
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সমাজমাধ্যমে পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ক্রাকভের এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে আমরা মানুষের সেরা দিকটি দেখেছি—পুলিশকর্মীদের সাহস, চিকিৎসাকর্মীদের নিষ্ঠা এবং অন্যদের বাঁচাতে সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ সাহায্য। তাঁদের কাছে আমরা গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ।’
ক্রাকভের মেয়র লুকাস গিবালা বলেছেন, ‘এমন সময়ে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। হিংসা আমাদের শহরের চরিত্র বদলাতে পারবে না। এই শহর গর্বিত, অতিথিপরায়ণ এবং সকলের জন্য উন্মুক্ত। এই চত্বর আবার আমাদের সবার হবে।’
হামলায় আহত এক পুলিশকর্মীর প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসক মাতেউশ ভিয়েরদাকের ভূমিকার কথাও জানিয়েছেন ক্রাকভের শল্যচিকিৎসক মিখাল পেদজিয়াত্র। তাঁর কথায়, ‘আততায়ীর মোকাবিলা করা পুলিশকর্মীর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। কোনও সুরক্ষা বা দস্তানা ছাড়াই তিনি শুধু ওই পুলিশকর্মীর দিকে মন দিয়েছিলেন এবং বুকের রক্তপাত বন্ধ করেছিলেন। সম্ভবত এ ভাবেই তাঁর প্রাণ বেঁচেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের বাসিন্দা এলিজাবেথ বোরচেক বলেন, ‘আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে ভেবেছিলাম, পোল্যান্ড খুব নিরাপদ দেশ। কিন্তু কী করব বুঝতে পারছিলাম না। মানুষকে দৌড়তে দেখছিলাম, গুলির শব্দ শুনছিলাম, উপর দিয়ে হেলিকপ্টারও উড়ছিল।’




