নন্দীগ্রাম: একটা ফোনই যেন বদলে দিয়েছিল ভাগ্য। ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কর্মসূচিতে আবেদন করার কিছু দিনের মধ্যেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকে গিয়েছিল আবাস প্রকল্পের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামের বহু পরিবারের কাছে সেটাই ছিল বাস্তব। কিন্তু সরকার বদলের পরে সেই সব ফাইল ফের খুলতেই সামনে আসছে একের পর এক প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় নন্দীগ্রাম বিধানসভায় প্রায় ১৭ হাজার নতুন বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার। প্রকৃত গৃহহীনদের চিহ্নিত করতে শুরু হয়েছে বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষা। সেই সমীক্ষার নথি ঘাঁটতেই প্রশাসনের হাতে এসেছে একাধিক অভিযোগ। কোথাও পাকা বাড়ির মালিকের নামেই আবাসের টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কোথাও আবার সরকারি অনুদান তোলার পরও বাড়ি নির্মাণের কোনও কাজই শুরু হয়নি।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, আগের সরকারের আমলে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের কালীচরণপুর, নন্দীগ্রাম, কেন্দামারি-জলপাই, মহম্মদপুর এবং সামসাবাদ— এই পাঁচটি পঞ্চায়েতের প্রায় আড়াই হাজার উপভোক্তার হাতে প্রথম কিস্তি হিসেবে ৬০ হাজার টাকা করে তুলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সমীক্ষায় সেই তালিকারই একাংশ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
এক প্রশাসনিক কর্তার কথায়, এখন প্রতিটি আবেদন, জমির নথি এবং বাড়ির বর্তমান অবস্থা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। যেখানে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ মিলছে, সেখানেই উপভোক্তাদের নোটিস পাঠিয়ে সরকারি অর্থ ফেরত চাওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যক্তি টাকা জমা দিয়েছেন বলেও প্রশাসনের দাবি।
নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের এক আধিকারিক বলেন, “যাঁরা আবাসের টাকা নিয়েও বাড়ি করেননি অথবা পাকা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও সরকারি অনুদান নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অনেকেই টাকা ফেরত দিয়েছেন।”
তাঁদেরই একজন বলেন, “‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’তে ফোন করার পর আবাসের টাকা পেয়েছিলাম। কিন্তু পরে বাড়ি তৈরির পরিস্থিতি ছিল না। তাই প্রশাসনের নোটিস পেয়ে টাকা ফেরত দিয়েছি।”
এই ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিজেপির অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের আগে সরকারি প্রকল্পকে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার করা হয়েছিল। দলের তমলুক সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি প্রলয় পালের দাবি, “নন্দীগ্রামে জয়ের লক্ষ্যে নিয়মের তোয়াক্কা না করে আবাসের টাকা বিলি করা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর সমীক্ষা শুরু হতেই সেই অনিয়ম সামনে আসছে।”
যদিও বিজেপির অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল। দলের নেতা অখিল গিরির দাবি, “প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতেই আবাসের টাকা পৌঁছেছিল। বর্ষার কারণে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি নির্মাণ শুরু করতে পারেননি। তাই প্রশাসনের নির্দেশে টাকা ফেরত দিচ্ছেন। এর সঙ্গে কোনও দুর্নীতির সম্পর্ক নেই।”
সমীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ফলে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, পুরনো প্রকল্পের আরও নথি খতিয়ে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। আর তা ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত যে আরও বাড়বে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।