কলকাতা: দাবদাহে হাঁসফাঁস করছেন? দীর্ঘক্ষণ রোদে বা কারখানায় কাজ করতে করতে শরীর যেন আগুন হয়ে উঠছে? এমন পরিস্থিতিতে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য যদি একটি ‘ফ্রিজ’-এর ভিতরে ঢুকে শরীর ঠান্ডা করে আবার কাজে ফেরা যায়! শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও, সেটাই এবার বাস্তবে দেখিয়ে দিল জাপান।
অত্যধিক গরমে কর্মরত শ্রমিকদের হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচাতে জাপানের একটি সংস্থা তৈরি করেছে এক অভিনব কুলিং ক্যাবিন, যার নাম ‘ডো হিয়েমন বক্স’ (Do Hiemon Box)। তবে ইতিমধ্যেই এটি সারা বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘হিউম্যান রেফ্রিজারেটর’ বা মানুষের ফ্রিজ নামে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।
ফ্রিজ নয়, মানুষের জন্য শীতল আশ্রয়
বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা বড় রেফ্রিজারেটর বা ভেন্ডিং মেশিনের মতো। কিন্তু এর ভিতরে রাখা হয় না খাবার বা পানীয়— ঢোকেন মানুষ।
জাপানের রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তি সংস্থা SDRS এবং শিল্প সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী Trusco Nakayama-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই বিশেষ ক্যাবিনে কয়েক মিনিট বসে থাকলেই শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত কমতে শুরু করে। মূল লক্ষ্য, কর্মীদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই মিলবে স্বস্তি
এই বিশেষ ক্যাবিনের ভিতরের তাপমাত্রা প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা হয়। ভিতরে বসলে মাথা, ঘাড়, কাঁধ এবং পিঠের দিকে বিশেষ নোজল থেকে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয়।
সংস্থার দাবি, মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শরীরের অতিরিক্ত তাপ অনেকটাই কমে যায়। আর ১০ মিনিট পর্যন্ত থাকলে শরীরের ক্লান্তি, অতিরিক্ত ঘাম এবং হিট এক্সহস্টশনের উপসর্গও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?
এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে নির্মাণ শ্রমিক, কারখানার কর্মী, গুদাম কর্মী, লজিস্টিকস কর্মী, ডেলিভারি স্টাফ এবং খোলা আকাশের নীচে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা মানুষের জন্য।
জাপানে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাপপ্রবাহ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। প্রতি বছর বহু মানুষ হিটস্ট্রোকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সেই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন।
কম বিদ্যুৎ, সহজে বহনযোগ্য
এই কুলিং ক্যাবিনে রয়েছে একাধিক কুলিং মোড। নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট সময় পরে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। চাকার উপর বসানো হওয়ায় সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি প্রচলিত স্পট এয়ার কন্ডিশনারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ খরচ হয় বলে দাবি প্রস্তুতকারী সংস্থার।
দামও কম নয়
জাপানে এই ‘হিউম্যান রেফ্রিজারেটর’-এর দাম রাখা হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ ইয়েন, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ লক্ষ টাকা।
প্রথম পর্যায়ে শিল্প সংস্থা ও কারখানাগুলিতে এটি ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাস, বিমানবন্দর কিংবা বড় নির্মাণ প্রকল্পেও এমন কুলিং ক্যাবিন বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নতুন দিশা
বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। দাবদাহ এখন আর শুধু গ্রীষ্মের সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তারও বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পরিস্থিতিতে জাপানের এই 'হিউম্যান রেফ্রিজারেটর' শুধুমাত্র একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মপরিবেশকে আরও নিরাপদ করে তোলার এক সাহসী উদ্যোগ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক সময় মানুষ খাবার ঠান্ডা রাখতে ফ্রিজ বানিয়েছিল। এবার সেই ফ্রিজই যেন মানুষের শরীরকে তাপপ্রবাহের হাত থেকে বাঁচানোর অস্ত্র হয়ে উঠতে চলেছে।