নয়াদিল্লি: আবেদন করেছে প্রায় তিন বছর আগে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সদস্য হওয়ার জন্য একের পর এক দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছে ইসলামাবাদ। কিন্তু এখনও BRICS-এর দরজা খোলেনি পাকিস্তানের জন্য। বরং নয়াদিল্লিতে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হল—শুধু আবেদন করলেই এই জোটে ঢোকার সুযোগ মিলছে না। দরকার সদস্য দেশগুলির সম্মতি। আর সেখানেই পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারত।
তিন বছর আগে আবেদন, এখনও অপেক্ষা
BRICS-এর সদস্যপদ পাওয়ার জন্য পাকিস্তান ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে আবেদন করেছিল। সেই সময় ইসলামাবাদের লক্ষ্য ছিল দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির এই গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা। পাকিস্তানের আশা ছিল, BRICS-এর সম্প্রসারণের সুযোগে তারাও সদস্যপদ পাবে।
কিন্তু সেই আবেদন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালে BRICS-এর সম্প্রসারণের সময়ও পাকিস্তান সদস্য হতে পারেনি। তার পরে জোটের পরিধি আরও বেড়েছে, নতুন দেশ যুক্ত হয়েছে, সহযোগী দেশের কাঠামোও তৈরি হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান এখনও বাইরে।
BRICS-এর দরজায় সবচেয়ে বড় তালা কি ভারত?
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সমস্যাটা শুধু অর্থনৈতিক যোগ্যতার নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনীতির। BRICS-এ নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলির ঐকমত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আপত্তি জানালে নতুন দেশের প্রবেশ আটকে যেতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও সাম্প্রতিক রিপোর্টে পাকিস্তানের সদস্যপদ আটকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ভারতের আপত্তির কথা উঠে এসেছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংঘাত, সীমান্ত উত্তেজনা এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ এই সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করেছে। অর্থাৎ ইসলামাবাদ যতই অন্য সদস্যদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করুক, নয়াদিল্লির আপত্তি কাটিয়ে ওঠা না গেলে BRICS-এর পূর্ণ সদস্য হওয়ার রাস্তা কঠিনই থেকে যাচ্ছে।
রাশিয়ার সমর্থন চেয়েও কি লাভ হল না?
পাকিস্তান শুধু আবেদন করেই বসে থাকেনি। BRICS-এর প্রভাবশালী সদস্য রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল, মস্কোর সমর্থন পেলে সদস্যপদের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
চিনের সঙ্গেও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে BRICS-এর ভিতরে পাকিস্তানের পক্ষে একাধিক শক্তিশালী দেশের সমর্থন আদায়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু BRICS-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের চেয়ে সদস্যদের সম্মতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেই আটকে যাচ্ছে পাকিস্তানের হিসাব।
ইসলামাবাদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ BRICS?
BRICS-এ ঢোকার চেষ্টা পাকিস্তানের কাছে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সম্মান পাওয়ার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্য।
পশ্চিমা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে চিন, রাশিয়া, ভারত, ইরান, ব্রাজিল এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চায় পাকিস্তান। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সঙ্কটে থাকা ইসলামাবাদের কাছে নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সুযোগ এবং উন্নয়নমূলক অর্থায়নের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
BRICS-এর সঙ্গে যুক্ত New Development Bank-ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই সদস্যপদ পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতীক নয়—অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও দরজা।
BRICS যত বড় হচ্ছে, পাকিস্তানের অপেক্ষাও তত দীর্ঘ
BRICS প্রথমে ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত একটি ছোট গোষ্ঠী। পরে সম্প্রসারণের মাধ্যমে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী-সহ আরও দেশ যুক্ত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও সদস্য হয়েছে। ফলে BRICS-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে।
২০২৪ সালে আবার একাধিক দেশকে ‘পার্টনার কান্ট্রি’ কাঠামোয় আনার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে সদস্যপদ না পেলেও BRICS-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার একটি বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পাকিস্তানের লক্ষ্য এখনও পূর্ণ সদস্যপদ। আর সেই পথেই আটকে আছে ইসলামাবাদ।
নয়াদিল্লির মাটিতে পাকিস্তানের স্বপ্নে আরও ধাক্কা
এ বার ২০২৬ সালে ভারতের সভাপতিত্বে নয়াদিল্লিতে বসেছে BRICS-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্বশাসন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ এবং বহুপাক্ষিকতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। BRICS-এর সদস্যরা যৌথ ঘোষণাপত্রও গ্রহণ করেছে।
এই সম্মেলনে পাকিস্তানের সদস্যপদ নিয়ে কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় ইসলামাবাদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হল।
আর ঘটনাচক্রে ভারতের মাটিতে BRICS-এর এই বড় সম্মেলনেই পাকিস্তানকে বাইরে থাকতে হল—যে বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতার প্রতীক হিসাবেও দেখা হচ্ছে।
পহেলগাঁওয়ের ছায়াও কি রয়েছে?
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ এখন অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০২৫ সালের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তলানিতে পৌঁছয়। BRICS-এর সাম্প্রতিক ঘোষণাতেও পহেলগাঁও হামলার নিন্দা করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলা হয়েছে। যদিও ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের নাম করা হয়নি।
ফলে ইসলামাবাদের BRICS-প্রবেশের প্রশ্নে নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা অস্বাভাবিক নয়।
চিন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা বনাম ভারতীয় আপত্তি
এখানে আরও একটি বড় কূটনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। চিন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আবার চিন নিজেও BRICS-এর অন্যতম প্রধান শক্তি। অন্য দিকে ভারতও BRICS-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি।
ফলে পাকিস্তানকে সদস্য করার প্রশ্নটি কার্যত BRICS-এর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।
চিন যদি পাকিস্তানের সদস্যপদের পক্ষে থাকে এবং ভারত আপত্তি জানায়, তা হলে বিষয়টি শুধু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকে না। BRICS-এর ভিতরে ভারত-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতারও নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তবে পাকিস্তানের জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ?
এখনই এমন কথা বলার সুযোগ নেই। BRICS একটি সম্প্রসারণশীল গোষ্ঠী। আগামী দিনে সদস্যপদের নিয়ম, রাজনৈতিক সমীকরণ কিংবা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বদলালে পরিস্থিতিও পাল্টাতে পারে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় পাকিস্তানের সামনে তিনটি বড় বাধা—ভারতের আপত্তি, BRICS-এর সর্বসম্মতির প্রয়োজন এবং নিজেদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন। ফলে আবেদন করার প্রায় তিন বছর পরেও ইসলামাবাদকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদ, চাবি কোথায়?
পাকিস্তানের BRICS-যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—এই জোটে প্রবেশ শুধু অর্থনীতির অঙ্ক নয়, কূটনীতিরও কঠিন পরীক্ষা।
ইসলামাবাদ সদস্য হতে চায়। চিন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও রয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বৈরিতা সেই পথ আটকে দিচ্ছে। ফলে তিন বছর ধরে আবেদন করেও BRICS-এর ভিতরে ঢুকতে পারল না পাকিস্তান।
নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলন শেষ হয়েছে। নতুন ঘোষণাপত্রও গৃহীত হয়েছে। কিন্তু ইসলামাবাদের জন্য প্রশ্নটি থেকেই গেল—BRICS-এর দরজা খুলবে কবে? আর সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় তালাটি কি শেষ পর্যন্ত ভারতের হাতেই?