স্নিগ্ধা চৌধুরী: বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের সৃষ্টি কেবল তাঁদের সময়কে ধারণ করে না, সময়ের সীমানা অতিক্রম করে এক অনন্ত মানবিক অভিজ্ঞতার কাছে পৌঁছে যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বিরল কথাশিল্পীদের একজন। তাঁকে পড়তে গেলে মনে হয় না, আমরা কোনও দূর অতীতের একজন লেখকের লেখা পড়ছি; বরং মনে হয়, আমাদের চারপাশের কোনও অদৃশ্য মানুষটি খুব ধীরে জীবনের কথা বলে চলেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের নিয়ে যায় সেই বাংলায়, যেখানে পথের ধারে কাশফুল দুলত, সন্ধ্যার আলো নেমে আসত পুকুরের জলে, বাঁশবনের ভিতর দিয়ে হাওয়া বয়ে যেত, আর অতি সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ জীবনেও লুকিয়ে থাকত এক গভীর মহিমা।
বিভূতিভূষণের অসাধারণত্ব এখানেই, তিনি জীবনের এমন কোনও জায়গায় দাঁড়াননি, যেখান থেকে মানুষকে দূর থেকে দেখা যায়; তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, মানুষের সঙ্গে হেঁটেছেন, তাদের অভাব-অনটন, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, ভালোবাসা ও একাকিত্বকে নিজের হৃদয়ের ভিতর দিয়ে অনুভব করেছেন। তাই তাঁর সাহিত্য পড়লে চরিত্ররা কাগজের মানুষ বলে মনে হয় না; তারা আমাদের আপনজন হয়ে ওঠে, তাদের হাসি-কান্না আমাদের নিজের জীবনেরই কোনও অপ্রকাশিত অধ্যায়কে স্পর্শ করে।
বিভূতিভূষণের সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত তাঁর প্রকৃতি। কিন্তু তাঁর প্রকৃতিকে কেবল প্রকৃতির বর্ণনা বলে দেখলে তাঁর সাহিত্যকে ছোট করে দেখা হয়। তাঁর কাছে প্রকৃতি ছিল জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য ভাষা। একটি গাছ, একটি নদী, একটি মাঠ, একটি পাখির ডাক, শরতের কাশবন কিংবা বর্ষার ভেজা মাটির গন্ধ,এসব তাঁর লেখায় কখনও নিছক দৃশ্য হয়ে থাকে না; মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে তারা হয়ে ওঠে এক একটি জীবন্ত সত্তা। তাঁর প্রকৃতির মধ্যে যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনই আছে রহস্য, বিষাদ, নিঃসঙ্গতা এবং অসীমতার অনুভব।
‘আরণ্যক’-এর অরণ্য তাই শুধু গাছপালা আর বন্যতার সমষ্টি নয়; সে যেন মানুষের আত্মার আরেকটি ভূখণ্ড, যেখানে সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়ায়। অরণ্যের নিস্তব্ধতার মধ্যে বিভূতিভূষণ শুনতে পান এমন এক সঙ্গীত, যা শহুরে জীবনের কোলাহলে ক্রমশ হারিয়ে যায়। তাঁর প্রকৃতি মানুষকে গ্রাস করে না, বরং মানুষকে নিজের গভীরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেই কারণেই তাঁর প্রকৃতি পাঠকের মনে শুধু চোখের ছবি তৈরি করে না, তৈরি করে এক ধরনের অনুভূতি যে অনুভূতিতে মনে হয়, পৃথিবী আসলে আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বড়, গভীর এবং রহস্যময়।
‘পথের পাঁচালী’ তাঁর সাহিত্যজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেও তাকে কেবল একটি উপন্যাসের সাফল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। অপু, দুর্গা, সর্বজয়া, হরিহর তাঁরা যেন একটি পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে বাংলার বৃহত্তর জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া সেই ছোট ছোট আনন্দ, অনিশ্চয়তার মধ্যে শিশুর বিস্ময়, মায়ের অদৃশ্য যন্ত্রণা, বাবার স্বপ্ন এবং প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম সবকিছুকে বিভূতিভূষণ এমন মমতা দিয়ে দেখেছেন যে পাঠক ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, মানুষের জীবনের মহত্ত্ব সবসময় বড় ঘটনায় প্রকাশ পায় না। কখনও একটি শিশুর দৌড়ে, কখনও একটি মায়ের অপেক্ষায়, কখনও কোনও অচেনা শব্দের প্রতি বিস্ময়ে, কখনও বা একটি সামান্য আনন্দের মুহূর্তে মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের সৌন্দর্য প্রকাশিত হতে পারে।
দুর্গার কাশবনের ভিতর দিয়ে ছুটে যাওয়া কিংবা অপুর চোখে প্রথম ট্রেন দেখার বিস্ময় তাই নিছক গল্পের ঘটনা নয়; এগুলি বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা কিছু মুহূর্ত, যেগুলির মধ্যে আমাদের নিজেদের শৈশবও কোথাও যেন লুকিয়ে আছে। এই কারণেই ‘পথের পাঁচালী’ পড়তে পড়তে অনেক সময় আমরা অপু-দুর্গাকে ভুলে নিজেদের ছোটবেলায় ফিরে যাই; মনে পড়ে যায় সেইসব দিন, যেগুলি একসময় আমাদের কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক সত্য, অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেগুলি আমাদের জীবন থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে।
বিভূতিভূষণের মানুষরা মূলত সাধারণ মানুষ, এবং সেই সাধারণত্বের মধ্যেই তিনি তাঁদের অসাধারণ করে তুলেছেন। তাঁর চরিত্রদের জীবনে প্রায়ই নেই অর্থের নিশ্চয়তা, সামাজিক ক্ষমতা কিংবা বাহ্যিক সাফল্যের জৌলুস; কিন্তু আছে অনুভব করার ক্ষমতা, স্বপ্ন দেখার সাহস, ভালোবাসার গভীরতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকার এক সহজাত শক্তি। তিনি দরিদ্র মানুষকে করুণার চোখে দেখেননি, আবার তাদের দুঃখকে রোমান্টিকও করেননি; বরং তাঁদের জীবনকে তার সমস্ত আলো-অন্ধকারসহ গ্রহণ করেছেন।
তাঁর লেখায় ক্ষুধা যেমন সত্য, তেমনই সত্য একটি শিশুর হাসি; দারিদ্র্য যেমন নির্মম, তেমনই নির্মল একটি বিকেলের সৌন্দর্য; বিচ্ছেদ যেমন গভীর, তেমনই গভীর মানুষের ভালোবাসা। এই ভারসাম্যই তাঁর সাহিত্যকে এত মানবিক করে তোলে। তিনি আমাদের শেখান, কোনও মানুষের জীবনকে শুধু তার অভাব দিয়ে বিচার করা যায় না। যে মানুষটি সারাদিন জীবিকার চিন্তায় ক্লান্ত, সেও সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকিয়ে সৌন্দর্য অনুভব করতে পারে; যে সংসারে অন্নের অভাব, সেখানেও ভালোবাসার অভাব নাও থাকতে পারে। মানুষের এই জটিল অথচ কোমল সত্যটিকে বিভূতিভূষণ অসামান্য সংবেদনশীলতায় ধরেছিলেন।
তাঁর লেখার ভাষাও তাঁর সাহিত্যিক সত্তার এক অনন্য পরিচয়। সেখানে শব্দের বাহুল্য নেই, নেই কৃত্রিম অলংকারের ভার; অথচ প্রতিটি বাক্যের ভিতরে যেন মাটির গন্ধ লেগে থাকে। তাঁর গদ্য কখনও নদীর মতো ধীরে বয়ে যায়, কখনও হঠাৎ কোনও দৃশ্যের সামনে থেমে যায়, আবার কখনও নিঃশব্দে পাঠকের হৃদয়ের এমন কোনও দরজা খুলে দেয়, যার অস্তিত্ব পাঠক নিজেও জানতেন না। তিনি উচ্চকণ্ঠে সৌন্দর্যের ঘোষণা করেন না; বরং সৌন্দর্যকে জীবনের স্বাভাবিক অংশের মতো আমাদের সামনে রেখে দেন।
তাঁর লেখায় একটি সন্ধ্যা শুধুই সন্ধ্যা নয়, একটি পথ শুধুই পথ নয়, একটি বিদায় শুধুই বিদায় নয়। প্রত্যেকটি দৃশ্যের আড়ালে যেন আরেকটি গভীর অর্থ অপেক্ষা করে থাকে। তাঁর গদ্য পড়লে মনে হয়, লেখক পৃথিবীকে দেখেছেন অত্যন্ত মন দিয়ে,যে মন দিয়ে আমরা সাধারণত আর দেখি না। দ্রুতগতির জীবনে যে সামান্য ঘটনাগুলি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, বিভূতিভূষণের সাহিত্য সেগুলিকেই থামিয়ে দেয়, তাদের দিকে তাকাতে শেখায় এবং বলে,এই সামান্যতার মধ্যেই তো জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
সম্ভবত এই কারণেই আধুনিক সময়েও বিভূতিভূষণ এত প্রাসঙ্গিক। আমরা যত আধুনিক হয়েছি, ততই যেন প্রকৃতি থেকে দূরে সরে গেছি; প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, কিন্তু নিজের ভিতরের নীরবতার সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়েছে। আমরা মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খবর জানতে পারি, অথচ নিজের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছের দিকে তাকানোর অবসর অনেক সময় আমাদের থাকে না। আমাদের জীবন দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সেই দ্রুততার ভিতর কোথাও যেন হারিয়ে গেছে ধীরতার সৌন্দর্য।
বিভূতিভূষণের বই খুললে সেই হারিয়ে যাওয়া ধীরতা ফিরে আসে। মনে হয়, একটু থামা যায়, একটি বিকেলকে দীর্ঘ করে দেখা যায়, একটি নদীর স্রোত শোনা যায়, একটি পাখির ডাকের অর্থহীন অথচ মায়াময় সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। তাঁর সাহিত্য আমাদের কোনও উপদেশ দেয় না; শুধু আমাদের এমন এক পৃথিবীর সামনে দাঁড় করায়, যেখানে মানুষ এবং প্রকৃতি এখনও পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মমতা মানুষের প্রতি মমতা, প্রকৃতির প্রতি মমতা, জীবনের প্রতি মমতা। মৃত্যুকে তিনি চিনেছেন, দুঃখকে চিনেছেন, বিচ্ছেদকে চিনেছেন; কিন্তু তবু তাঁর সাহিত্য জীবনবিমুখ নয়। বরং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে অনুভব করেই তিনি জীবনের প্রতি আরও গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তাঁর চরিত্ররা হারায়, ভেঙে পড়ে, দূরে চলে যায়, কখনও ফিরে আসে না; কিন্তু তাদের স্মৃতি থেকে যায়।
তাঁর প্রকৃতিও ঋতুর সঙ্গে বদলে যায়, ফুল ঝরে যায়, নদী শুকিয়ে যায়, পথের চেহারা পালটে যায়; কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেই জীবনের অনন্ত প্রবাহকে তিনি অনুভব করেন। যেন তিনি জানতেন,কিছুই চিরস্থায়ী নয়, অথচ এই ক্ষণস্থায়ীতার মধ্যেই মানুষের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। তাই তাঁর সাহিত্য পড়লে বিষাদ আসে, কিন্তু সেই বিষাদ অন্ধকার নয়; তার মধ্যে এক ধরনের নির্মল আলো থাকে।
আজও কোনও নির্জন দুপুরে ‘পথের পাঁচালী’ খুললে, কিংবা ‘আরণ্যক’-এর পাতায় চোখ রাখলে, মনে হয় সময় যেন হঠাৎ পিছিয়ে গেছে। শহরের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, সামনে খুলে যায় একটি মেঠোপথ; তার পাশে ঘাস, দূরে গাছের সারি, আকাশে অলস মেঘ, আর বাতাসে ভেসে আসে কোনও অচেনা পাখির ডাক। সেই দৃশ্যের মধ্যে হয়তো অপু নেই, দুর্গা নেই, নেই সেই পুরনো বাংলার সংসার; তবু তাদের অনুপস্থিতির মধ্যেই তারা আরও গভীরভাবে উপস্থিত হয়ে ওঠে।
তখন বোঝা যায়, বিভূতিভূষণ আসলে কোনও হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীকে শুধু লিখে রেখে যাননি; তিনি সেই পৃথিবীকে আমাদের স্মৃতির ভিতর বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর বই তাই কেবল পড়া যায় না তার ভিতর প্রবেশ করা যায়, সেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকা যায়, নিজের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির সঙ্গে দেখা করা যায়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে যায়? হয়তো কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নেই। তিনি আমাদের নিয়ে যান মানুষের কাছে, প্রকৃতির কাছে, শৈশবের কাছে, স্মৃতির কাছে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে আমরা বুঝতে পারি, সাহিত্য শুধু গল্প বলার শিল্প নয়; সাহিত্য কখনও কখনও এমন একটি আয়না, যেখানে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া মুখ দেখতে পাই। বিভূতিভূষণ সেই আয়নাটি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
তাঁর চলে যাওয়ার বহু বছর পরেও তাঁর শব্দের ভিতর বাংলার মাটি শুকিয়ে যায়নি, তাঁর অরণ্যের পাতা ঝরে শেষ হয়ে যায়নি, তাঁর চরিত্রদের চোখের জলও মুছে যায়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর সাহিত্য ততই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষ যত দূরেই যাক, তার ভিতরে কোথাও একটি মাটির পথ থেকে যায়; একটি শৈশব থেকে যায়; একটি নদী থেকে যায়; একটি অরণ্য থেকে যায়। আর সেই অরণ্যের নিস্তব্ধতার মধ্যে আজও যেন শোনা যায় বিভূতিভূষণের কলমের শব্দ অত্যন্ত ধীরে, অত্যন্ত মমতায়, জীবনের কথা লিখে চলেছে।
তাই বিভূতিভূষণকে পড়া মানে শুধু একজন সাহিত্যিককে পড়া নয়; তাঁকে পড়া মানে নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সেই মানুষটির কাছে ফিরে যাওয়া, যে এখনও একটি নির্মল আকাশ দেখে থমকে দাঁড়াতে জানে, কাশবনের হাওয়ায় শৈশবের গন্ধ পায়, আর অন্ধকারের মধ্যেও বিশ্বাস করে,এই পৃথিবী এখনও সুন্দর।