দিব্যেন্দু ঘোষ, নিউজ ডেস্ক: বাঙালির থালায় মাছ-মাংস কমন। রবি-দুপুরে কিংবা পুজো-পার্বণে সে থালার সাদা ভাত কিংবা আটা-ময়দার রুটি-লুচি তেলতেলে না হলে বাঙালির রসনা আবেগে ভর দিয়ে হাঁটে না। কচি পাঁঠার ঝোল ভাত থেকে, পাত থেকে উধাও হলে বাঙালি তেড়ে গাল দেয়, ম্যাদামারা মুখে দুনিয়ার বিরক্তি এনে জড়ো করে। বাঙালির সন্তান দুধে-ভাতে তো থাকেই, মাছে বাঁচে, মাংসেও। কিন্তু এক বাবা এসে সব গুবলেট করে দিয়েছেন। নাম তাঁর বাগেশ্বর বাবা। তাঁর নিরামিষ ফতোয়ায় বাঙালির মহাষ্টমী কি তবে ডাল-খিচুড়ির জেলখানা?
কলকাতায় পা রেখে ভক্তি আর ইবাদতের বাজারের পাশাপাশি এক চমৎকার ফুড-পলিটিক্স বা খাদ্য-রাজনীতির হাঁড়ি চড়িয়ে দিয়েছেন বাগেশ্বর বাবা ওরফে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। সোজা বাংলায় তাঁর নিদান, দুর্গাপুজোয় যাঁরা আমিষ খান, তাঁরা নাকি ‘পাখণ্ডী’ বা ভন্ড। ব্যস, এই কথাটি বায়ুবেগে ছড়িয়ে পড়তেই বাঙালির পাতে সোজা গিয়ে পড়েছে গেরুয়া ও সাদা ভাতের হাতা। প্রশ্ন উঠেছে, ভক্তি কি তবে এবার ঠিক করে দেবে কার পাতে কী উঠবে?
কতটা ঠিক আর কতটা ভুল, এই অঙ্ক কষা বড় সহজ নয়। ধর্মীয় আচার বা শুদ্ধতার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কোনও সাধু বা সন্ত তাঁর অনুগামীদের নিরামিষ খাওয়ার উপদেশ দিতেই পারেন। ভক্তের তাতে ঈশ্বরপ্রাপ্তি হলে কারও বয়েই গেল। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন সেই উপদেশ সর্বজনীন ফরমানি বা ফতোয়ার রূপ নেয়। বিশেষ করে এমন এক ভূখণ্ডে, যেখানে ধর্ম মানেই উৎসব, আর উৎসব মানেই মহাষ্টমীর লুচি-আলুর দম ছাপিয়ে মহানবমীর কচি পাঁঠার মাংস এক পবিত্র সামাজিক উপাসনা। সেখানে এসে ভিনরাজ্যের কোনও গুরুর মুখে আমিষভোজীদের ‘পাখণ্ডী’ শোনার জোকসটা আর বরদাস্ত করতে পারেনি আমজনতা। ফলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাপকাঠিতে এই নিদান শতভাগ ভুল।
বাঙালি এই পুরো ব্যাপারটাকে দেখছে বিরাট বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক বেআক্কেলেপনা হিসেবে। বাঙালির চোখে এটা ভিনদেশি সংস্কৃতির অবাঞ্ছিত মোড়ক। যে জাতি রবি ঠাকুর থেকে শুরু করে ইলিশ-পাঁঠার ঝোলে অভ্যস্ত, তাদের হঠাৎ ফুড পুলিশিংয়ের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। বাঙালি জানে, মা কালী বা উমা উভয়েই বহু পুরনো প্রথায় বলি ও আমিষ ভোগের সঙ্গে যুক্ত। তাই পেটের খিদেকে ধর্মের সঙ্গে সেঁধিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টাকে বাঙালি নিছকই আজব রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছে।
বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে লুফে নিয়েছে দারুণ রাজনৈতিক খোরাক। সিপিএম ও কংগ্রেস সোচ্চার। কংগ্রেসের অভিযোগ, বাংলার সংস্কৃতিতে এই ধরনের গেরুয়া ছড়ি ঘোরানো আসলে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক এজেন্ডারই অংশ। বামেদের কটাক্ষ, ভিনরাজ্যের এই বাবাজিরা আসলে নির্দিষ্ট শিবিরের স্লিপার সেলের মতো কাজ করছে, যাদের কাজ ধীরে ধীরে বাঙালির থালা থেকে মাছ-মাংসের টুকরো সরিয়ে সেখানে একরঙা নিরামিষ থিওরি বসানো।
বিপাকে পড়ে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান রাজ্য বিজেপি। একদিকে কেন্দ্রীয় বা ভিনরাজ্যের সনাতনী ভাবাবেগের তোষণ, অন্যদিকে বাঙালি আবেগের খাড়ায় কোপ, এই সাঁড়াশি চাপে পড়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে সরাসরি বলতে হয়েছে, “নবমীতে বাঙালি পাঁঠার মাংস খাবেই, বাঙালির খাদ্যাভ্যাস কোনও সাধু বা দল ঠিক করে দেবে না।” এমনকি স্বামী বিবেকানন্দের দোহাই দিয়ে শমীক বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলার মাটিতে ভিনদেশি আধ্যাত্মিক মোড়লিপনা ধোপে টিকবে না। আরএসএস এবং ভিএইচপি বরাবরই নিরামিষবাদ এবং সনাতনী খাদ্যাভ্যাসের পবিত্রতাকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু বাংলার মাটিতে পা রেখে এই ধরনের ফর্মুলা যে হিতে বিপরীত হতে পারে, তা গেরুয়া শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
আমজনতা অবশ্য এই পুরো বিতর্ককে পপকর্ন সামনে রেখে সিনেমা দেখার মতো উপভোগ করছে। মধ্যবিত্তের চায়ের কাপ থেকে সোশাল মিডিয়ার মিম, সব জায়গাতেই এখন ট্রোলের ঝড়। কেউ বলছেন, “বাবাজি মনে হয় জানেন না নবমীর মাংস ছাড়া বাঙালির পুজো মানে বিনা লবণের তরকারি।” কেউ আবার বলছেন, “ভবিষ্যতে বোধহয় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার আগে রসিদ দেখাতে হবে টিকিট কাউন্টারে, আজ দুপুরে ফিশ ফ্রাই খেয়েছ কি না!” সব মিলিয়ে, কলকাতার এই আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক কোনও উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক চর্চা নয়। এটি আসলে সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির এক অদ্ভুত খিচুড়ি। রাজনীতি তার নিজের স্বার্থে ধর্মকে বারবার ডিনারে ডাকতে চায়, কিন্তু বাঙালি সেই ডিনারে আমিষের বদলে নিরামিষ মেনু দেখলে টেবিল চাপড়ে প্রতিবাদ করতে ভাসে না। শেষ পর্যন্ত জয় সেই পাঁঠার মাংসেরই হয়, যা বাঙালির প্লেটে এবং আবেগে সমান্তরালে বহমান। ধর্ম থাক পুজোর বেদিতে, আর কচি পাঁঠা থাকুক নবমীর পাতে, এটুকুই বাংলার চটজলদি এবং অকাট্য রায়।