নয়াদিল্লি: দেশের বৃহত্তম সরকারি পরিষেবাগুলির অন্যতম ভারতীয় রেল। প্রতিদিন কোটি কোটি যাত্রীর যাতায়াত, লক্ষ লক্ষ কর্মীর বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো এবং হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প— সব মিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ খুবই কম রাখতে চায় কেন্দ্র। সেই লক্ষ্যেই এবার আরও এক কড়া পদক্ষেপ করল রেল মন্ত্রক। দুর্নীতি, অসততা এবং কর্মদক্ষতার অভাবের অভিযোগে পাঁচ জন গ্রুপ 'এ' আধিকারিককে নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসর দেওয়ার সুপারিশ করেছে রেল বোর্ডের রিভিউ কমিটি। কেন্দ্রের দাবি, এটি কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়; বরং 'জনস্বার্থে প্রশাসনকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার উদ্যোগ'।
রেল মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, ভারতীয় রেলওয়ে এস্টাবলিশমেন্ট কোডের রুল ১৮০২(এ)-এর আওতায় এই সুপারিশ করা হয়েছে। এই বিধানটি কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফান্ডামেন্টাল রুল ৫৬(জে)-এর সমতুল্য। ওই নিয়মে সরকারকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট বয়স বা চাকরির মেয়াদ অতিক্রম করা কোনও আধিকারিকের কর্মক্ষমতা, সততা বা জনস্বার্থের প্রশ্নে সন্দেহ দেখা দিলে তাঁকে স্বাভাবিক অবসরের আগেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়।
এই তালিকায় রয়েছেন ভারতীয় রেল স্বাস্থ্য পরিষেবার (আইআরএইচএস) দুই জন সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ গ্রেডের আধিকারিক। পাশাপাশি উত্তর রেলের ভারতীয় রেল ইঞ্জিনিয়ারিং পরিষেবার (আইআরএসই) এক জন জুনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ গ্রেডের আধিকারিক, ভারতীয় রেল বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনিয়ারিং পরিষেবার (আইআরএসইই)-এর এক জন আধিকারিক এবং পশ্চিম রেলের ভারতীয় রেল ট্রাফিক পরিষেবার (আইআরটিএস)-এর এক জন জুনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ গ্রেডের আধিকারিকও রয়েছেন।
রেল বোর্ড জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কোনও একদিনে নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের গোটা কর্মজীবনের নথি দীর্ঘ সময় ধরে খতিয়ে দেখেছে বিশেষ রিভিউ কমিটি। শুধু বার্ষিক গোপনীয় রিপোর্ট (APAR) নয়, তাঁদের সততা সংক্রান্ত নথি, ভিজিল্যান্স রিপোর্ট, বিভাগীয় তদন্ত, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এবং সামগ্রিক কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচ জনের ক্ষেত্রে আগাম অবসরের সুপারিশ করা হয়েছে।
রেল মন্ত্রকের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট— দুর্নীতি, অসততা এবং অদক্ষতার ক্ষেত্রে ভারতীয় রেলের নীতি 'জিরো টলারেন্স'। সরকারি পরিষেবায় সততা, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহি কোনওভাবেই আপসের বিষয় হতে পারে না। তাই প্রশাসনের উচ্চস্তরে থাকা আধিকারিকদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দফতরে কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমিক পরিষেবা পর্যালোচনার প্রবণতা বেড়েছে। উদ্দেশ্য, শুধু দুর্নীতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত মানের কাজ করতে পারছেন না বা যাঁদের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁদেরও প্রশাসনের বাইরে রাখা। এর ফলে কর্মসংস্কৃতিতে ইতিবাচক বার্তা যায় এবং কর্মক্ষম আধিকারিকদের উৎসাহও বাড়ে।
ভারতীয় রেলের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও বেশি। কারণ, রেলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি যাত্রীর নিরাপত্তা, পরিষেবার মান এবং বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবহার। ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রেল মন্ত্রক।
তবে প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ফান্ডামেন্টাল রুল ৫৬(জে)-এর আওতায় আগাম অবসর কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। এটি সরকারের একটি প্রশাসনিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে জনস্বার্থে এমন আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়, যাঁদের পরিষেবায় রাখা আর প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয় না। ফলে এই ধরনের পদক্ষেপের লক্ষ্য শাস্তি দেওয়া নয়, প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনবিশ্বাস অটুট রাখা।
রেলের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল— দেশের বৃহত্তম সরকারি সংস্থাগুলির একটিতে পদমর্যাদা যতই উঁচু হোক, সততা, কর্মদক্ষতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নে কোনও রকম আপসের জায়গা নেই। প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করে তুলতে ভবিষ্যতেও এই ধরনের পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছে রেল মন্ত্রক।