বাংলাকে ধর্ম শেখাতে আসার আগে বাংলার মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করতে হয়। কারণ এই মাটির ধর্ম কোনও একরৈখিক বিধিনিষেধের ধর্ম নয়; এই মাটির ধর্ম বহুত্বের, সাধনার, প্রশ্ন করার, গ্রহণ করার। এখানে শাক্তের পাশে বৈষ্ণব, মন্দিরের পাশে মসজিদ, বেদান্তের পাশে লোকাচার, সব মিলিয়েই বাংলার আত্মপরিচয়।
অথচ আজ এমন এক অদ্ভুত সময়ের সাক্ষী আমরা, যখন কয়েক দিনের জনপ্রিয়তা, কয়েকটি উগ্র উচ্চারণ আর ধর্মের পোশাকের জোরে কেউ কেউ বাংলার কোটি মানুষের ধর্মাচরণের ওপর সার্টিফিকেট বিলি করতে নেমে পড়েছেন।
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর বক্তব্য তাই নিছক একটি খাদ্যাভ্যাসের মন্তব্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। কারণ প্রশ্নটি মাছ-মাংসের থালায় আটকে নেই। প্রশ্নটি আরও গভীর, একজন মানুষ কীভাবে নিজের ধর্ম পালন করবেন, সেই অধিকারটুকুও কি এখন কোনও স্বঘোষিত ধর্মগুরুর অনুমতির ওপর নির্ভর করবে?
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে কেবল চার দিনের পূজা নয়। এটি স্মৃতি, সংস্কৃতি, পারিবারিক রীতি এবং বহু প্রজন্মের আবেগের সম্মিলিত উৎসব। বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজোয় যুগে যুগে নানা রকম খাদ্যাচার, ভোগ ও পারিবারিক প্রথা চলে এসেছে। কোথাও নিরামিষ, কোথাও মাছ! বাঙালির ধর্মাচারকে একটি মাত্র ছাঁচে ঢেলে দেওয়ার ইতিহাস নেই।
আর এখানেই আসে আরও বড় একটি প্রশ্ন। শ্রীরামকৃষ্ণকে কি তাঁর নিজের বাংলাতেই নতুন করে ধর্মের পাঠ পড়াতে হবে?
যে বাংলায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বহুত্বকে স্বীকার করেছিলেন, যে বাংলায় মা সারদার মানবিকতা ধর্মের সীমানাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, যে বাংলায় স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে কেবল আচার নয়, মানুষের শক্তি, আত্মমর্যাদা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, সেই বাংলায় আজ কেউ এসে খাবারের থালা দেখে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের মাপজোক করবেন?
এ কেমন ধর্ম? এ কেমন অধিকারবোধ? শ্রীরামকৃষ্ণের উত্তরাধিকার যদি সত্যিই হৃদয়ে ধারণ করা হয়, তবে মানুষের রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে তার ঈশ্বরবিশ্বাসের বিচার করার এমন ঔদ্ধত্য আসার কথা নয়।
আর যে মানুষ দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস খায়, তাকে ‘পাষণ্ড’, ‘ভণ্ড’ কিংবা অধার্মিক বলে দাগিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা আসলে ধর্মকে মহৎ করে না, ধর্মের নাম করে মানুষের স্বাধীন বিবেককে অপমান করে।
হিন্দুধর্ম কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। কোনও বাবার জমিদারি নয়। কোনও মঞ্চের মাইক্রোফোনও নয়। হিন্দুধর্ম এত ঠুনকো নয় যে কারও মুখের কথায় একজন হিন্দুর ধর্মীয় পরিচয় বাতিল হয়ে যাবে।
আর সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন আরও সরাসরি। যাঁরা বাংলার মানুষের জন্য নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁরা কি এই ঔদ্ধত্যের সামনে নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন? রাজনৈতিক লাভের অঙ্কে কি বাংলার সংস্কৃতিকে বন্ধক রাখা হবে? ভোটের রাজনীতির জন্য যদি ধর্মের নামে মানুষের খাবার, পোশাক, আচার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর পাহারা বসানো হয়, তবে সেই পাহারাদারির বিরুদ্ধে কথা বলাই নাগরিকের কর্তব্য।
বাংলা কারও ধর্মীয় পরীক্ষাগার নয়। বাংলার মানুষকে কে হিন্দু, কে পাষণ্ড, কে ভক্ত, কে অবিশ্বাসী এই সার্টিফিকেট দেওয়ার লাইসেন্স কোনও স্বঘোষিত ধর্মগুরুকে বাংলার মানুষ দেয়নি।
মনে রাখা দরকার, বাংলার দুর্গা বাংলার ঘরের মেয়ে। বাংলার ধর্ম বাংলার মানুষের আত্মার বিষয়। আর বাঙালির বিবেকের দরজায় কোনও ‘বাবা’র পাহারাদারি চলবে না। ধর্ম যদি মানুষকে বড় না করে, তবে সেই ধর্মের নামে অহংকার কেবল শব্দের আতিশয্য।
রামকৃষ্ণের বাংলায় রামকৃষ্ণকে অপমান করে ধর্ম শেখানোর এই দুঃসাহসের জবাব যুক্তিতে, ইতিহাসে এবং বাংলার জাগ্রত বিবেকে দেওয়াই হোক।