জয়পুর: ভারতের ইতিহাসকে এত দিন যে চোখে দেখেছেন, জয়পুরে এসে সেই চোখটাই যেন বদলে গিয়েছে। আমেরিকার নিউ ইয়র্কের ট্যাটু শিল্পী জেমা ফেরার জুলকা এখন রাজস্থানে। ঘুরছেন, দেখছেন, ছবি তুলছেন, আর নিজের সমাজমাধ্যমে তুলে ধরছেন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিক। তারই মধ্যে তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল আলোচনা, ‘‘ভারত গরিব ছিল না, ভারতকে গরিব করা হয়েছিল।’’ জেমার বক্তব্যের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন বহু ভারতীয়।
সুূত্র: https://www.instagram.com/reel/DbLdeewJcmG/?stkn=MTJ0cTl3aTFqYXpkcw==
জেমার বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাস। তাঁর মতে, পশ্চিমের জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও সিনেমায় ভারতকে প্রায়ই দারিদ্র, ভিড় এবং নিম্নমানের জীবনযাপনের সঙ্গে জুড়ে দেখানো হয়। অথচ ভারতেরই যোগ, আয়ুর্বেদ, ধ্যান, বস্ত্রশিল্পের মতো ঐতিহ্য এখন বিশ্বজুড়ে বড় শিল্প ও বাজারের অংশ। তাঁর প্রশ্ন, যে সংস্কৃতি থেকে গোটা পৃথিবী উপকৃত হচ্ছে, সেই সংস্কৃতির স্রষ্টাদেরই কি যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হচ্ছে?
জয়পুর সফরে এসে ভারতের এই বৈপরীত্যই জেমাকে ভাবিয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, আগে ভারতের সৌন্দর্য ও ইতিহাসের গভীরতা তিনি ঠিক ভাবে বুঝতে পারেননি। এ দেশে এসে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছে। এখন নিজের শিল্পের মাধ্যমে ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির কথা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি।
বিশেষ করে ভারতের বস্ত্রশিল্পের ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলেছেন জেমা। তুলো, মসলিন এবং রেশমের মতো ভারতীয় বস্ত্র এক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্রিটিশ শাসন এবং সেই সময়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতির ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের বড় ক্ষতি হয়। তাঁতিদের পাশাপাশি বহু কারিগরও তার প্রভাবের মুখে পড়েছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের পতন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
জেমার বক্তব্য অবশ্য শুধু অর্থনীতি বা শিল্পের ইতিহাসে আটকে থাকেনি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথও তাঁকে বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করেছে। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ভারত যে ভাবে অহিংসার পথ বেছে নিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আর এখানেই তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি। ভারতের ইতিহাসকে শুধু দারিদ্রের গল্প হিসাবে না দেখে শিল্প, সংস্কৃতি, জ্ঞান, ঐতিহ্য এবং ঔপনিবেশিক শোষণের দীর্ঘ ইতিহাসের ভিতর দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। কেউ ভারতের ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর উপলব্ধির প্রশংসা করেছেন, কেউ আবার ঔপনিবেশিক অর্থনীতির ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন।
তবে জেমার মন্তব্যকে শুধুমাত্র ‘ভারতপ্রেমী বিদেশিনির প্রশংসা’ হিসেবে দেখলে বক্তব্যটির মূল জায়গাটি হারিয়ে যায়। তাঁর কথার ভিতরে রয়েছে পশ্চিমে ভারতকে দেখার প্রচলিত ছবির সমালোচনাও। এক দিকে ভারতকে দারিদ্রের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা, অন্য দিকে ভারতীয় যোগ, আয়ুর্বেদ, ধ্যান কিংবা বস্ত্র-ঐতিহ্যকে বিশ্ববাজারে গ্রহণ করা, এই দ্বৈত মানসিকতার দিকেই আঙুল তুলেছেন তিনি।
জয়পুরে কয়েক দিনের সফরেই তাই নিজের ভারত-ভাবনা নিয়ে নতুন করে কথা বলছেন নিউ ইয়র্কের এই শিল্পী। তাঁর বক্তব্যে ইতিহাসের সঙ্গে মিশেছে সংস্কৃতি, অর্থনীতির সঙ্গে মিশেছে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ভারতকে বাইরে থেকে দেখতে এসে ভারতকেই যেন নতুন করে দেখতে শিখেছেন জেমা। আর তাঁর সেই উপলব্ধির এক লাইনের সারকথা এখন সমাজমাধ্যমে ঘুরছে, ‘ভারত গরিব ছিল না, ভারতকে গরিব করা হয়েছিল।’