পোর্ট মোরসবি: দর্শকদের চোখের সামনে তখন চলছে কুমিরকে খাবার দেওয়ার পর্ব। আচমকাই জল থেকে ছুটে এসে কর্মীর পায়ে কামড় বসাল বিশাল কুমিরটি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে টেনে নিয়ে গেল ঘেরের জলে। প্রাণ বাঁচাতে পুকুরের ধার আঁকড়ে ঝুলে রইলেন তিনি। চারপাশ থেকে ছুটে এলেন দর্শকেরা। কেউ লোহার রড এগিয়ে দিলেন, কেউ হাত বাড়িয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কুমিরের চোয়াল থেকে পা ছাড়ানো গেল না। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর হাসপাতালে মৃত্যু হল পাপুয়া নিউ গিনির এক বন্যপ্রাণী পার্ককর্মীর।
ঘটনাটি শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, পোর্ট মোরসবির অ্যাডভেঞ্চার পার্কে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, কুমিরকে খাওয়ানোর সময় ঘেরের ভিতরে ছিলেন ওই কর্মী। একটি মুরগি নিয়ে কুমিরটির কাছে যেতেই আচমকা সেটি তাঁর পায়ে কামড়ে ধরে। তার পর জলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় গোটা পরিবেশ—বন্যপ্রাণী দেখার আনন্দ পরিণত হয় আতঙ্কে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা যায়, পুকুরের ধারে কোনও রকমে নিজেকে ধরে রেখেছেন ওই কর্মী। কুমিরের চোয়াল তখনও তাঁর পায়ে শক্ত করে আটকে। আশপাশে জড়ো হওয়া মানুষ তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। প্রত্যক্ষদর্শী গিবসন জন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আহত কর্মী প্রবল যন্ত্রণায় ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে ঠিক ভাবে চিৎকারও করতে পারছিলেন না।
উদ্ধারের চেষ্টা চললেও কুমিরটি পা ছাড়েনি। খবর পেয়ে পুলিশ এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। শেষ পর্যন্ত আহত কর্মীকে মুক্ত করতে কুমিরটিকে গুলি করা হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় থ্রি মাইল জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু পরের দিন, রবিবার সকাল ৭টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁর একটি পা গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে তাঁর পরিচয় বা আঘাতের সম্পূর্ণ বিবরণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার কারণ এবং পার্কের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তদন্ত শুরু হওয়ার কথা।
ঘটনার পর আপাতত অ্যাডভেঞ্চার পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মীর শেষকৃত্যের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, বন্যপ্রাণীর এত কাছাকাছি কর্মীদের কাজ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল? বিশেষ করে খাওয়ানোর সময় কর্মীর অবস্থান, ঘেরের নকশা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—তা নিয়েও তদন্তকারীদের নজর থাকবে।
এই ঘটনায় ফের সামনে এল বন্দি বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ঝুঁকি। প্রশিক্ষিত কর্মী হলেও কুমির যে মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক আচরণ বদলে আক্রমণ করতে পারে, পোর্ট মোরসবির এই ঘটনা তারই ভয়াবহ স্মৃতি রেখে গেল। দর্শকদের বিনোদনের জন্য তৈরি ঘের—সেই ঘেরই শেষ পর্যন্ত এক কর্মীর কাছে হয়ে উঠল মৃত্যুফাঁদ।