রাঁচি, নিউজ ডেস্ক: সকাল ছ’টা। জেলের গেট খুলল। একে একে কয়েক জন বন্দি বেরিয়ে গেলেন। গন্তব্য জেলের বাইরে—কাজের জায়গা। কেউ হয়তো যাবেন নির্মাণকাজে, কেউ কোনও দোকান বা প্রতিষ্ঠানে, কেউ করবেন অন্য কোনও পেশা। দিনের শেষে হাতে থাকবে উপার্জনের টাকা। কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই ফেরার পালা। ঠিকানা সেই জেলই। গেট পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলবে, কিন্তু রাত কাটবে না জেলের বাইরে। কাজ শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতে হবে কারাগারে।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এমনই নতুন ব্যবস্থা চালুর পথে ঝাড়খণ্ড। বন্দিদের শুধুই শাস্তি দেওয়া নয়, জেল থেকে বেরোনোর পর যাতে তাঁরা সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই প্রস্তুতি জেলের ভিতর থেকেই শুরু করতে চাইছে রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যেই নির্বাচিত বন্দিদের দিনের বেলা জেলের বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তবে শর্ত একটাই, সন্ধ্যায় আবার ফিরতে হবে জেলে।
প্রথম ধাপে রাজ্যের চারটি কেন্দ্রীয় জেলে এই ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তুতি চলছে। রাঁচির বিরসা মুন্ডা সেন্ট্রাল জেল, হাজারিবাগের জয়প্রকাশ নারায়ণ সেন্ট্রাল জেল, পূর্ব সিংভূমের ঘাঘিডিহ সেন্ট্রাল জেল এবং দুমকা সেন্ট্রাল জেলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ওই জেলগুলিতে ইতিমধ্যেই এমন ব্যারাক ও সেল চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলিকে ‘ওপেন’ অথবা ‘সেমি-ওপেন’ ব্যারাকে বদলানো যাবে।
কারা দফতরের আইজি সুদর্শন মণ্ডলের কথায়, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্বাচিত বন্দিরা সকাল ৬টা বা ৭টার দিকে জেল থেকে বেরিয়ে কাজে যেতে পারবেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা বাইরে থাকার পরে তাঁদের জেলে ফিরে আসতে হবে। চারটি জেলই শহরাঞ্চলে হওয়ায় কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি বলে মনে করছে প্রশাসন। ফলে বন্দিরা শুধু কাজের অভিজ্ঞতাই অর্জন করবেন না, নিজেদের পরিবারের জন্য অর্থও উপার্জন করতে পারবেন।
তবে ‘জেলের দরজা খুলে দেওয়া’ মানেই যে সব বন্দির জন্য এই সুযোগ, তা নয়। বরং গোটা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশই হল বাছাই। কারা বাইরে গিয়ে কাজ করার যোগ্য, তা ঠিক করতে তৈরি হবে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়র বা এসওপি। বন্দির জেলের ভিতরের আচরণ, নিয়মকানুন মেনে চলার রেকর্ড-সহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, কারাগারে দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন—এমন বন্দিদেরই ধীরে ধীরে এই সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা।
কেন এই ব্যবস্থা?
কারা প্রশাসনের ভাবনায়, জেল থেকে এক দিন হঠাৎ করে মুক্তি পাওয়ার পরে সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক বন্দির কাছেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ দিন জেলের চার দেওয়ালের মধ্যে থাকার পরে কাজের বাজার, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক—সব কিছুই বদলে যেতে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক অনিশ্চয়তা। ফলে মুক্তির পরে আবার অপরাধের জগতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকেই সংশোধনাগারের ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে চাইছে ঝাড়খণ্ড।
এই ব্যবস্থায় বন্দি সাজা ভোগ করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে কাজের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও রাখবেন। নিজের শ্রমে আয় করবেন। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ পাঠাতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তির আগেই বাইরের জীবনের সঙ্গে ধীরে ধীরে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হবে। সরকারের লক্ষ্য তাই শুধু ‘কাজের সুযোগ’ দেওয়া নয়—বন্দিকে ভবিষ্যতের জীবনের জন্য তৈরি করা।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে আইনি ভিত্তিও রয়েছে। ঝাড়খণ্ড সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে ২০২৫ সালের ঝাড়খণ্ড প্রিজন অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিসেস আইনে থাকা ‘ওপেন কারেকশনাল ইনস্টিটিউশন’-এর ব্যবস্থাকে সামনে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের ‘সুহাস চকমা বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলার নির্দেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যে সব রাজ্যে কার্যকর ওপেন কারেকশনাল ইনস্টিটিউশন নেই, সেখানে তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বলেছিল শীর্ষ আদালত। আলাদা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব না হলে বিদ্যমান জেলের মধ্যেই ‘ওপেন’ বা ‘সেমি-ওপেন’ ব্যারাক তৈরির কথাও বলা হয়েছিল। অর্থাৎ, ঝাড়খণ্ডের পরীক্ষাটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। দেশের কারা-ব্যবস্থায় ‘শাস্তি’ থেকে ‘সংশোধন’—এই পরিবর্তিত ভাবনার সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে।
তবে প্রশ্নও থাকছে। বন্দিরা বাইরে গিয়ে কোথায় কাজ করবেন? তাঁদের উপর কী ধরনের নজরদারি থাকবে? নির্দিষ্ট সময়ে কেউ জেলে না ফিরলে কী ব্যবস্থা হবে? বাইরে কাজ করার সময় কোনও অপরাধে জড়িয়ে পড়লে দায় কার? নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে রাখা হবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই নির্ভর করবে তৈরি হতে চলা এসওপির উপর। প্রশাসনের বক্তব্য, সব নিয়ম স্পষ্ট করার পরেই ব্যবস্থাটি কার্যকর করা হবে। তবু এই উদ্যোগের ভিতরে যে ছবিটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল—জেলের পাঁচিলের ভিতরে থেকেও বাইরের জীবনের প্রস্তুতি।
এখানে বন্দিকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর সাজাও মকুব হচ্ছে না। কিন্তু দিনের একটা অংশের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে পাঁচিলের দরজা। হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে কাজের সুযোগ। বলা হচ্ছে—নিজের শ্রমে উপার্জন করো, পরিবারের পাশে দাঁড়াও, সমাজের সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি করো। আর দিনের শেষে ফিরে এসো।
সকালটা হয়তো স্বাধীন জীবনের মহড়া। সন্ধ্যাটা আবার কারাবাসের বাস্তবতা। দুইয়ের মাঝখানেই ঝাড়খণ্ড খুঁজছে বন্দি-সংশোধনের নতুন পথ।




