বিশেষ প্রতিবেদন, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: ভারতের গণতন্ত্র কি আজ এমন এক সঙ্কটের মুখে, যার সমাধান শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ বা অপসারণে সম্ভব নয়? নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের সঙ্কটকে কোনও একটি পদ বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার গভীরতর সমস্যাগুলি আড়ালেই থেকে যাবে। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, ক্ষমতার উপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখা।
নির্বাচন কমিশন ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব কমিশনের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। লোকসভা, বিধানসভা এবং রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোটের ফল শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটায় না, রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা ও জনমতের প্রতিফলন হিসাবেও কাজ করে। সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখা যে কোনও নির্বাচনের জন্য জরুরি। মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, একাধিক জায়গায় থাকা নাম শনাক্ত করা এবং যোগ্য ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা—এসবই নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ পড়লে, অথবা নথি যাচাইয়ের জটিলতায় সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়লে, সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন যথাযথ শুনানি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং ভুল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা। কোনও ভোটারের নাম বাদ পড়ার কারণ স্পষ্ট করা, আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠলে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ, ভোটাধিকার কেবল একটি প্রশাসনিক নথিতে নাম থাকার বিষয় নয়; এটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মৌলিক শর্ত।
তবে সঙ্কটের পরিধি নির্বাচন কমিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচারব্যবস্থা এবং সংবাদমাধ্যম—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। সরকার নীতি নির্ধারণ করবে, প্রশাসন তা কার্যকর করবে, আদালত আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যা দেবে এবং সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার ব্যবহারকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করবে। এই ব্যবস্থার কোনও একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়লে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপ বাড়ে। আর একাধিক প্রতিষ্ঠান যদি স্বাধীন ভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এখানেই গণতন্ত্রের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। কোনও সরকার নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত হয়ে যায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের অধিকার দেয়, কিন্তু সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করার অনুমতি দেয় না। একই ভাবে বিরোধীদের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়; তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে বিকল্প তুলে ধরা এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই জবাবদিহি দাবি করা। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ভর করে এই দুই পক্ষের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কতটা নিয়ম মেনে চলছে, তার উপরেও।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কে অতীতের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ২০১৯ সালে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তৎকালীন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা কয়েকটি সিদ্ধান্তে ভিন্নমত জানিয়েছিলেন। পরে তাঁর নির্বাচন কমিশন ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলি থেকে সরাসরি কোনও বেআইনি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কী ভাবে নথিবদ্ধ হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং ভিন্নমতের জায়গা কতটা সুরক্ষিত—সেই প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জরুরি। গণতন্ত্রে আদালত নাগরিকের অধিকার রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থলগুলির অন্যতম। কিন্তু আদালতের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, যুক্তিনির্ভর রায় এবং সাংবিধানিক প্রশ্নে ধারাবাহিকতা। সরকারের সিদ্ধান্তের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবার আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষপাত জুড়ে দেওয়াও সমাধান নয়। প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থা তৈরি হয় তাদের কাজের স্বচ্ছতা, যুক্তি এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে।
সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা বিরোধীদের অভিযোগ—সব কিছুরই স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম যদি রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, অথবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলার জায়গা সংকুচিত হয়, তবে সাধারণ নাগরিকের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছনোর পথ দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তাই শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়; নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ারও অন্যতম শর্ত।
এই পরিস্থিতিতে শুধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে পরিবর্তন ঘটলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। কোনও ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু তার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ম, রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী আচরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা দরকার। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার অর্থ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, একই নিয়ম ও মানদণ্ড কার্যকর রাখা।
সংস্কারের প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পক্ষে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা সংশোধনে বাদ পড়া নাম ও আপত্তির নিষ্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য সহজে নাগরিকের নাগালে পৌঁছনো দরকার। তৃতীয়ত, কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে উপযুক্ত স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। চতুর্থত, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে দল নির্বিশেষে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। আর পঞ্চমত, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে সংবিধানসম্মত জবাবদিহির পরিসর বজায় রাখতে হবে।
গণতন্ত্রের সঙ্কট মোকাবিলায় নাগরিকের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভোট দেওয়া, তথ্য যাচাই করা, শান্তিপূর্ণ ভাবে মতপ্রকাশ করা এবং সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা—এসবের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদকে শত্রুতায় পরিণত না করে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনও অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রতিদিনের প্রশাসন, বিচার, সংবাদপ্রবাহ এবং নাগরিক জীবনের মধ্যে কার্যকর থাকা একটি ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে বিতর্ক ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির বৃহত্তর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার একটি উপলক্ষ। কিন্তু একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেই যদি প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের আস্থা ফিরে আসবে বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে সমস্যার গভীরে পৌঁছনো সম্ভব নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হল—নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য রাখা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটের বাক্সে নয়; সেই ভোটের উপর মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখার মধ্যেই তার আসল ভিত্তি।
