বাদুড়ের বিষ্ঠায় ঢাকা একটি করিডর। অথচ সেখানেই অবহেলায় পরে রয়েছে মধ্যযুগীয় বাঙালি শিল্পীদের তৈরি করা সবচেয়ে গৌরবময় দেওয়ালচিত্রগুলির কয়েকটি। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত এই ছবিগুলিতে এখনও কিছুটা জৌলুস অবশিষ্ট রয়েছে। সূক্ষ্ম কালো রেখা, নিপুণভাবে আঁকা আঙুল এবং যত্নের সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা পোশাকের নকশায় আজও স্পষ্ট হয়ে ওঠে দক্ষ শিল্পীর হাতের ছোঁয়া।
কিন্তু কীভাবে এই শিল্পীরা নিজেদের মাতৃভূমি থেকে এত দূরে পৌঁছেছিলেন? আর কীভাবেই বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত মায়ানমারে তাঁদের শিল্পকর্ম টিকে রইল, যখন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সেই শিল্পের কোনও চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই?
হারিয়ে যাওয়া এক বৌদ্ধ রাজ্য: মায়ানমারের বাগান ছিল মধ্যযুগে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য। নবম শতকে প্রতিষ্ঠিত এই রাজ্যের পতন ঘটে ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গোলদের আক্রমণে। দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের প্রায় সমসাময়িক ছিল এই রাজ্য। চোলদের মতোই বাগানেরও স্বর্ণযুগ ছিল একাদশ শতকে। সেই সময় পরপর দুই রাজা—অনাওরাথা বা অনিরুদ্ধ (১০৪৪–১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ) এবং কিয়ানজিথা (১০৮৪–১১১২/১৩ খ্রিস্টাব্দ)—প্রতিবেশী রাজ্যগুলির উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দূতাবাস পাঠান।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিয়ানজিথা সিঁদুরের রং ব্যবহার করে সোনার পাতের উপর ‘চোলি যুবরাজ’ নামে পরিচিত এক ভারতীয় শাসককে চিঠি লিখেছিলেন। মনে করা হয়, এই শাসক সম্ভবত চোল সম্রাট প্রথম কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০–১১২২ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন। কিয়ানজিথার দাবি ছিল, তাঁর চিঠি পড়ে ওই চোল শাসক ‘ভুল মতবাদের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে’ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর সেই চোল শাসক কিয়ানজিথাকে মুক্তো, রত্নখচিত একটি বৃক্ষ এবং বিবাহের জন্য নিজের কন্যাকে উপহার হিসেবে পাঠান। কিয়ানজিথা মহাবোধি মন্দিরের সংস্কারের জন্যও অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য রাজাদের হাতে মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বিহারে কোনও তুর্কি সেনাবাহিনীর প্রবেশের এক শতাব্দীরও বেশি আগে এই সংস্কারের কাজ হয়েছিল।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আমি বাগান পরিদর্শন করি। ইরাবতী নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীরবেষ্টিত এই ইটের শহরটি ছিল মধ্যযুগের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী। নদীর উজান থেকে এখানে আসত মূল্যবান কাঠ, হাতি ও সুগন্ধি দ্রব্য। অন্যদিকে, ইরাবতী বদ্বীপের নিম্নপ্রবাহে অবস্থিত অধীনস্থ রাজ্যগুলির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় রাখত বাগান।
ইরাবতীর নিম্নপ্রবাহের এই রাজ্যগুলিতে খ্রিস্টীয় প্রথম দিকের শতক থেকেই বৌদ্ধধর্মের প্রচলন ছিল। সেই সময় বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এখানে এসেছিলেন বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক সন্ন্যাসী ও বণিকরা। এই অঞ্চলের মানুষ মূলত বৌদ্ধধর্মের রক্ষণশীল থেরবাদ শাখা অনুসরণ করতেন। থেরবাদ শব্দের অর্থ ‘প্রবীণদের পথ’। অন্যদিকে, উত্তর ভারতে তত দিনে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটছিল, যেখানে ভবিষ্যৎ বুদ্ধদের উপাসনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে গুহ্যযান বা বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম। এই ধারায় তন্ত্রসাধনা, পবিত্র চিত্র ও মণ্ডল, দেবী এবং বিভিন্ন উপাচারের গুরুত্ব রয়েছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে মায়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, তিব্বত ও নেপালের বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে বজ্রযানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কীভাবে পতন ঘটল বাগানের? বাগানের পতনের ইতিহাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু প্রাচীন রাজ্যের পতনের ধারার সঙ্গে মিলে যায়। বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজাদের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। রাজবংশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রতিবেশী বাংলাতেও প্রায় একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। ত্রয়োদশ শতকে মধ্য এশিয়ার সম্প্রসারণবাদী শক্তিগুলির আক্রমণে দুই অঞ্চলেরই রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে। তুর্কি আক্রমণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়, অন্যদিকে মঙ্গোলরা বাগান লুণ্ঠন করে।
পরবর্তী শতকগুলিতে মায়ানমারে বৌদ্ধধর্ম দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হলেও বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম ও ইসলামের প্রসার ঘটে। বাংলার একসময়ের বিশাল বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারগুলি আক্রমণের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সম্ভবত স্থানীয় মানুষও সেখানকার ইট খুলে নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু বাগানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আলাদা। বার্মার একাধিক রাজবংশ প্রাচীন মন্দিরগুলির সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছিল। এমনকী অষ্টাদশ শতকেও কনবাউং রাজবংশের শাসনকালে এই ধরনের সংস্কার করা হয়। বাগানের স্থানীয় বাসিন্দারা বর্ষাকালে মন্দিরগুলিতে আশ্রয় নিতেন, তবে অন্য সময়ে সেগুলিকে অনেকাংশে আগের অবস্থাতেই রেখে দিয়েছিলেন।
মায়ানমারে যখনই রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, তখনই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সহায়তায় এই প্রাচীন দেওয়ালচিত্রগুলি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কাজে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া) এবং ইউনেস্কোর মতো সংস্থাও সাহায্য করেছে। আজও নীরবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে বাগান একসময় বাগানে পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ত। কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে যেখানে বছরে প্রায় ২ লক্ষ পর্যটক আসতেন, বর্তমানে সেখানে পর্যটকদের সংখ্যা অনেকটাই কমে গিয়েছে।
ভারতীয়দের একাংশ এখনও মায়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গনে বসবাস ও কাজ করেন। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাগানে যাওয়ার সুযোগ খুব কম ভারতীয়রই হয়। ফলে একাদশ শতকের বাঙালি শিল্পীদের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম আজও বাগানের পোড়ামাটির মন্দিরগুলিতে নীরবে টিকে রয়েছে। এই শিল্পকীর্তি একদিকে যেমন অতীতের গৌরবের স্মারক, অন্যদিকে তেমনই বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক উজ্জ্বল, অথচ ক্রমশ ম্লান হয়ে আসা নিদর্শন।
