নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: স্কুল আছে। শিক্ষক আছেন। পরিকাঠামোর হিসাবেও উন্নতির ছবি। অথচ শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে। কোথাও আবার স্কুলের দরজা খোলা থাকলেও পড়ুয়া হাতে গোনা। সরকারি পরিসংখ্যানের ‘উন্নতি’র ছবির সঙ্গে মাটির বাস্তবের এই ফারাকই এখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
এক দিকে কেন্দ্রীয় তথ্য বলছে, সরকারি স্কুলে শিক্ষক ও বিভিন্ন পরিকাঠামোগত সুবিধা বেড়েছে। অন্য দিকে, মাঠপর্যায়ের ছবিতে দেখা যাচ্ছে বহু স্কুলে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো থাকলেও তার ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজস্থানের একাধিক সরকারি স্কুলের এমনই নানা অসঙ্গতির ছবি সামনে এনেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ুয়া সংখ্যায়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল প্রায় ১২.১৬ কোটি। অথচ একই সময়ে বহু সরকারি স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা এতটাই কম যে স্কুল চালানোর যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। জাতীয় স্তরে ৬৫ হাজারেরও বেশি সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য অথবা ১০-এর নীচে বলে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে পৃথক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু স্কুল কমে যাওয়া নয়। আসল সমস্যা হল—যে স্কুলে পড়ুয়া নেই বা অতি সামান্য, সেখানে শিক্ষক, কর্মী এবং সরকারি পরিকাঠামো কতটা কার্যকর ভাবে ব্যবহার হচ্ছে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে দেশের বদলে যাওয়া জনসংখ্যার ছবিও। জন্মহার কমছে। বহু এলাকায় শিশুদের সংখ্যা কমছে। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের একটা বড় অংশ সরকারি স্কুলের বদলে বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে কোথাও সরকারি স্কুলে পড়ুয়া কমছে, আবার কোথাও কয়েকটি স্কুলে পড়ুয়া জমা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ছবিটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। সরকারি স্কুলের উপর এখনও রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভরশীল। কিন্তু একই সঙ্গে অতি কম পড়ুয়া থাকা সরকারি স্কুলের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ সরকারি স্কুল ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং তার ভিতরের বণ্টন ক্রমশ অসম হয়ে উঠছে।
শিক্ষক নিয়েও তৈরি হয়েছে একই রকম বৈপরীত্য। জাতীয় স্তরে শিক্ষক সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পড়ুয়া কমে যাওয়া স্কুলগুলিতে শিক্ষকের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এক দিকে কোথাও শিক্ষক প্রয়োজন, অন্য দিকে কোথাও পড়ুয়ার তুলনায় শিক্ষক এবং পরিকাঠামোর অনুপাত অস্বাভাবিক। বদলি, স্কুল একত্রীকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের মতো কারণে এই ভারসাম্যহীনতা দ্রুত কাটানো যাচ্ছে না বলেই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
আর এখানেই সরকারি পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবের ফারাকটি আরও স্পষ্ট। কাগজে-কলমে স্কুলে শৌচাগার আছে, ডিজিটাল সুবিধা রয়েছে, শিক্ষকও রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই শৌচাগার ব্যবহারযোগ্য কি না, ডিজিটাল সরঞ্জাম কাজ করছে কি না, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পড়াশোনা হচ্ছে কি না—তার উত্তর সব সময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। রাজস্থানের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এমনই একাধিক সমস্যার ছবি সামনে এসেছে।
তবে সব ছবিই অন্ধকার নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরে স্কুলছুটের হার কমেছে এবং পড়ুয়াদের ধরে রাখার হার বেড়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু স্কুলে পড়ুয়া আনা নয়; কোথায় পড়ুয়া যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এবং কোন স্কুলে তারা থাকতে চাইছে—সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা পরিকল্পনার পুরনো ছক নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এক সময়ের পরিকল্পনা ছিল, প্রতিটি বসতির কাছাকাছি একটি স্কুল। কিন্তু জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে যাওয়ায় সেই মডেল সব জায়গায় একই ভাবে কার্যকর থাকছে না। কোথাও স্কুল একীভূত করার প্রয়োজন, কোথাও আবার দূরবর্তী এলাকার শিশুদের কথা ভেবে ছোট স্কুল টিকিয়ে রাখাই জরুরি।
তাই শুধু ‘কতগুলি স্কুল আছে’, ‘কত জন শিক্ষক আছেন’ বা ‘কতগুলি শৌচাগার তৈরি হয়েছে’—এই হিসাব দিয়ে আর সরকারি শিক্ষার সাফল্য মাপা যাবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা স্কুলের সংখ্যা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হল—স্কুলে গিয়ে পড়ুয়ারা কী পাচ্ছে।
কারণ কাগজে স্কুল আছে, শিক্ষক আছেন, পরিকাঠামোও আছে—কিন্তু শ্রেণিকক্ষ যদি পড়ুয়ার অপেক্ষায় ফাঁকা থাকে, কিংবা থাকা পরিকাঠামোই যদি ব্যবহারযোগ্য না হয়, তবে সেই ‘উন্নতি’র হিসাব কতটা বাস্তব? ভারতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এখন তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—পরিসংখ্যানের উন্নতিকে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবে পৌঁছে দেওয়া।