বিশেষ প্রতিবেদন: বর্ষা নামলেই আতঙ্কের দুই নাম- ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া। একটির বাহক এডিস, অন্যটির অ্যানোফিলিস। আবার রাত নামলে ফাইলেরিয়া ও এনসেফেলাইটিসের আশঙ্কা বাড়ায় কিউলেক্স। দেখতে প্রায় একই রকম হলেও তিন মশার স্বভাব, চলাফেরা, কামড়ানোর সময় এবং ডিম পাড়ার জায়গা- সবই আলাদা। কোন মশা কখন কামড়ায়? কোথায় জন্মায়? কী ভাবে চিনবেন? জানাচ্ছেন স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পতঙ্গবিদ্যার প্রাক্তন প্রধান ডাঃ হিরন্ময় মুখোপাধ্যায়।
এডিস, দিনের আলোতেই বিপদ
ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার অন্যতম প্রধান বাহক এডিস। এই মশা মূলত দিনের বেলাতেই সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে সূর্যোদয়ের পর এবং সূর্যাস্তের আগে কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। খুব বেশি উঁচুতে উড়তে পারে না বলে সাধারণত পা, গোড়ালি কিংবা কোমরের নীচের অংশে কামড়ায়। এডিসের আর একটি ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য রয়েছে—‘ট্রান্স-ওভারিয়ান ট্রান্সমিশন’। অর্থাৎ, কোনও সংক্রমিত স্ত্রী মশার শরীরে থাকা ভাইরাস তার ডিমের মধ্যেও পৌঁছতে পারে। সেই ডিম থেকে জন্ম নেওয়া মশার শরীরেও ভাইরাস থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মশার ভাইরাস বহনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এডিসের ডিমের আরও একটি বিশেষত্ব—জলে না থাকলেও শুকনো অবস্থায় দীর্ঘ সময়, প্রায় এক বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তাই বাড়ির আশপাশের সামান্য জল জমার জায়গাও বিপদের কারণ হতে পারে।
অ্যানোফিলিস—রাত নামলেই সক্রিয়
ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিসের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এটি মূলত নিশাচর। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বেশি সক্রিয় থাকে। চেনার একটি সহজ উপায়ও রয়েছে। বসার সময় অ্যানোফিলিস শরীরের পিছনের অংশটি প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে উপরের দিকে তুলে রাখে। প্রজননের জন্য সাধারণত অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার, প্রাকৃতিক জলাশয় পছন্দ করে। ধানজমি, ঝোরা বা এমন ধরনের জল তার পছন্দের জায়গা। তাই শুধু নোংরা নর্দমা দেখেই মশার প্রজননস্থল ধরে নিলে চলবে না। বাড়ির আশপাশের জলজ পরিবেশের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
কিউলেক্স—নোংরা জলেই সংসার
ফাইলেরিয়া ও কিছু ধরনের এনসেফেলাইটিসের বাহক কিউলেক্স মশাও মূলত রাতের অন্ধকারে বেশি সক্রিয়। সূর্যাস্তের পর এর আক্রমণ বাড়ে। শহুরে পরিবেশে নোংরা, পচা জল, জৈব বর্জ্য মিশ্রিত নর্দমা, ডোবা কিংবা সেপটিক ট্যাঙ্ক কিউলেক্সের পছন্দের প্রজননস্থল। দিনের বেলায় ঘরের অন্ধকার কোণ, খাটের নীচে কিংবা ঝুলন্ত কাপড়ের পিছনেও লুকিয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ, মশা মানেই এক রকম নয়। দিনে যে মশা কামড়াচ্ছে, রাতের মশা তারই মতো দেখতে হলেও তার স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
তাহলে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, মশা মারার পাশাপাশি তার জন্ম বন্ধ করাই সবচেয়ে জরুরি। বাড়ির আশপাশে কোথাও জল জমতে দেওয়া যাবে না। ফুলের টব, এসি বা ফ্রিজের ট্রে, পরিত্যক্ত পাত্র—যে কোনও ছোট পাত্রেই এডিসের বংশবিস্তার হতে পারে।
জমে থাকা জল নিয়মিত ফেলে পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে তিন দিন অন্তর বাড়ির ভিতর ও চারপাশে কোথাও জল জমেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
রাতে অ্যানোফিলিস ও কিউলেক্সের হাত থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে লার্ভিসাইড ব্যবহার এবং বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখাও মশার বংশবিস্তার কমাতে সাহায্য করবে। কারণ মশা ছোট হলেও বিপদটা ছোট নয়। একটু জমা জল, একটি ফুলের টব কিংবা নোংরা নর্দমা, বর্ষার মরসুমে সেখান থেকেই শুরু হতে পারে অসুস্থতার গল্প।