কলকাতা,অঙ্কন দাস: রবিবার মানে মাংস,ভাত-ঘুম! এখন তার সাথে যদি একটা জমাটি কলকাতা ডার্বি হয়, কেমন হয়? দারুণ হয়। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন - একদিকে ইলিশ বাহিনী অন্য দিকে চিংড়ি সংঘ! লড়াই যখন সবুজ মাঠে, খেলাটা জমে ভাল! জীবন মানে ডার্বি-কলকাতা ডার্বি! একশ বছরের পুরনো শত্রুতা! ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান।
এখন কথা হচ্ছে,সাংবাদিক হিসেবে আমায় নিরপেক্ষ থাকতে হয়। কিন্তু, কখনও কখনও সেই সাংবাদিক পরিচয়কে ছাপিয়ে যায় আমার সমর্থক পরিচয়! প্রিয় দল হেরে গেলে চোখের কোল ছাপিয়ে আসে পদ্মা-মেঘনা'র জোয়ার-ভাটা। আর জিতে গেলে? আমার গলায় গর্জে ওঠে ঢাকা-কুমিল্লা থেকে অনেকদিন আগে শোনা কোনো বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ! যে বলেছিল, ‘হার মেনো না!’
সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছি আজন্মকাল। রক্তের বিপ্লবের, প্রতিবাদের লাল রং আর তার সাথে স্বপ্নের, ভরসার, লক্ষ্যপূরণের হলুদ রং! আমার সারা শরীর কাঁটাতার হয়ে যায়! গা বেয়ে জ্বর নেমে আসে;ঠোঁটের পাশে তিল দেখে ভালবাসতে ইচ্ছে করে! হাত বাড়িয়ে দিই-আমার হাত যে ধরে, তার অন্য হাতে মশাল!
আজকাল রাতের দিকে ভাল ঘুম হয়না। ঘুমের ভেতর 'লইট্যা মাছের ঝাল' নিয়ে অপেক্ষা করে মিনিদি। কার জন্য? জানি না। শুধু আবছা শুনেছিলাম; রিফিউজি পরিবার বলে 'সমস্ত কিছু'র পরেও বিয়েটা আর হয়নি। তাই ভাদ্র বিকেলে;হঠাৎ করেই,পাশের লন্ড্রিতে রেডিও বেজে ওঠে- 'মেরা কুছ সামান/ তুমহারে পাস পড়া হ্যায়।' আর সেলাই করতে করতে হার না মানার লক্ষ্যে চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে মিনিদির।
তিলু কে দেখি, সকাল থেকে বাইক সারাচ্ছে। হাতে তেল কালি, মুখেও লেগেছে... বাবার ক্যান্সার, মায়ের গলব্লাডার স্টোন। দিদির বিয়ে ভেঙে গেছে। রিফিউজি বলে। তাও বছর পঁচিশের তিলু হার মানবেনা। হতে চেয়েছিল ফুটবলার। দিদি সেলাই করে পয়সা জমিয়ে জার্সি, জুতো- এখন সব অতীত!
জার্সিটা তাকে তোলা আছে। পরম যত্নে, অনেক মায়ায় জড়ানো। যেদিন ইস্টবেঙ্গল জেতে, জার্সিটা পরে তিলু নাচে। আদিম সে নাচ। বন্য সে নাচ। সব হারিয়ে বাঁচার পর,জিতে যাওয়ার সে নাচ। সে নাচ জুড়ে দেয় বাংলাদেশ থেকে প্যালেস্টাইন! স্বপ্ন দেখে তিলুদের দল। স্বপ্ন দেখি আমরা - আমরন লড়াই করে যাওয়াটাই যাদের একমাত্র লক্ষ্য! আড়াল থেকে ভাই, তিলুকে নজর রাখে মিনিদি। লইট্যা মাছের স্বাদ ছড়িয়ে যায় ডুরান্ড ডার্বি জেতার উদযাপনে ।
খেলা শেষের বাঁশি বেজে যায়। এডমন্ড কে নিয়ে লাফাতে থাকি আমরা। গিল,বিপিন,জয় আমাদের বুকের পাঁজর হয়ে ওঠে! চার গোলের মালা পড়িয়ে দিই আমাদের চিরশত্রুকে। বুঝিয়ে দিই, ' কত্তা, বাঙালরা কারও ধার বাকি রাখে না! ‘মাঠের জবাব মাঠেই শোধ!’
তারপর ম্যাটাডোর চেপে কাদাপাড়া, হায়াত পেরিয়ে চলতে থাকি, চলতেই থাকি- মশাল বাহিনী হয়ে।