কলকাতা: পুজোর মুখে বাংলায় দুই বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন। আর তার আগেই আরও গভীর হল তৃণমূলের ঘরোয়া সংঘাত। দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ—তিন নিয়েই এ বার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দরজায় মুখোমুখি দুই শিবির। শনিবার দিল্লিতে কমিশনের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে নিজেদের দাবির পক্ষে নথি পেশ করল কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির। ফলে ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে কে লড়বে, সেই প্রশ্ন এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
উপনির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে আগামী ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন। ১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। ফলে হাতে সময় কার্যত অতি সামান্য। এই পরিস্থিতিতে ঘাসফুল প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শনিবার ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশীর সামনে দুই পক্ষ নিজেদের বক্তব্য রাখে। প্রথমে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে ঋতব্রত শিবির। প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকের পরে বাইরে এসে দলের অভ্যন্তরীণ পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরকে তীব্র আক্রমণ করেন ঋতব্রত।
‘তৃণমূল কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়’, দাবি ঋতব্রতদের
কমিশন থেকে বেরিয়ে ঋতব্রতের বক্তব্য, শুধু একজন নেতার কথায় দল চলতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের মতো একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নথি ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব থাকা উচিত। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলবেন, সেটিই শেষ কথা—এমন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক দলের হতে পারে না।
ঋতব্রতের দাবি, তৃণমূল কোনও পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। দলের প্রকৃত মালিক কর্মীরা। তাঁদের শিবির কমিশনের কাছে তথ্য ও নথির ভিত্তিতে নিজেদের দাবি জানিয়েছে বলেও জানান তিনি। ‘তৃণমূল’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক পাওয়ার ব্যাপারেও তাঁরা আশাবাদী।
দুই ঘণ্টা কমিশনে কালীঘাট শিবির
ঋতব্রতরা বেরিয়ে যাওয়ার পর কমিশনের দফতরে ঢোকেন কালীঘাট তৃণমূলের প্রতিনিধিরা। তাঁদের হয়ে বৈঠকে ছিলেন সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাকেত গোখলে-সহ অন্যরা। প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলে।
বৈঠক শেষে কল্যাণ জানান, কমিশন যে সব তথ্য জানতে চেয়েছে, তা তাঁদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। কমিশন কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিলে তার পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
‘প্রতীক’ নিয়ে পাল্টা যুক্তি কালীঘাটের
ঋতব্রতের ‘পৈতৃক সম্পত্তি’ মন্তব্যের পাল্টা জবাবও এসেছে কালীঘাট শিবির থেকে। কল্যাণের বক্তব্য, তৃণমূল তৈরি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রতীকের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। যে নেতারা এখন মমতার নেতৃত্বকে অস্বীকার করছেন, তাঁরাই কয়েক মাস আগে মমতার নেতৃত্বে এবং জোড়াফুল প্রতীকে ভোটে লড়েছেন—এই যুক্তিই কমিশনের সামনে তুলে ধরেছে কালীঘাট শিবির।
ফলে বিতর্কটি শুধু প্রতীক বা দলের নামের মধ্যে আটকে নেই। আসল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তৃণমূলের সাংগঠনিক বৈধতার দাবিদার কে?
কোথা থেকে শুরু এই ভাঙন?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরে নির্বাচনী বিপর্যয়ের দায় নিয়ে দলের অন্দরে শুরু হয় পরস্পরকে দোষারোপ। একাংশের আঙুল ওঠে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পাশে দাঁড়ান।
এর পর বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত আরও তীব্র হয়। প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম সামনে আসা, বিধানসভার স্পিকারকে দেওয়া চিঠি এবং সেই চিঠির স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে প্রকাশ্যে আসে দলের সাংগঠনিক বিভাজন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ তোলেন। পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনের ভিত্তিতে তাঁকেই বিরোধী দলনেতা করা হয়। সেখান থেকেই দুই পৃথক রাজনৈতিক শিবিরের অস্তিত্ব আরও স্পষ্ট হয়।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতীক—লড়াই ক্রমেই বিস্তৃত
বিধানসভায় নেতৃত্বের প্রশ্নের পর বিরোধ আরও গড়ায় দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, তহবিল এবং নির্বাচনী প্রতীকের দিকে। দুই পক্ষই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করতে শুরু করে। সেই টানাপড়েনে দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।
এ বার সেই সংঘাত পৌঁছেছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। কমিশনের হাতে ঋতব্রত শিবির বেশ কিছু সাংগঠনিক নথি তুলে দিয়েছে বলে সূত্রের খবর। দলের ওয়ার্কিং কমিটি কী ভাবে পরিচালিত হত, বর্তমানে কী ভাবে চলছে এবং বিভিন্ন বৈঠকের কার্যবিবরণী—এ ধরনের নথি তাদের দাবির সমর্থনে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ফয়সালা না হলে ‘ফ্রিজ’ হতে পারে ঘাসফুল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়। এক সম্ভাবনা হল, দ্রুত কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে নির্দিষ্ট একটি শিবিরকে আপাতত প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া। আবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছে।
সে ক্ষেত্রে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে দুই পক্ষকেই আলাদা নাম এবং অস্থায়ী নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে লড়তে হতে পারে। আবার ঋতব্রত শিবির প্রতীক পেলে কালীঘাটপন্থীদেরও অন্য প্রতীক নিয়ে ভোটে নামতে হবে।
অন্য একটি সম্ভাবনা—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশন আরও নথি ও তথ্য চাইতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপাতত জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ কালীঘাট শিবিরের হাতেই থেকে যেতে পারে।
শেষ নয়, শুরু হতে পারে আরও বড় আইনি লড়াই
তবে কমিশনের সিদ্ধান্তেই যে এই সংঘাতের শেষ হবে, এমন সম্ভাবনা কম। যে পক্ষই প্রতীক বা দলের নামের দাবিতে পিছিয়ে পড়বে, তারা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। অর্থাৎ উপনির্বাচনের আগে কমিশনের সিদ্ধান্ত একটি সাময়িক সমাধান দিলেও তৃণমূলের ভিতরের এই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এখন তাই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ভোট শুধু দুই আসনের লড়াই নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—‘তৃণমূল’ নামটি কার, জোড়াফুল কার, আর বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে ‘আসল তৃণমূল’ হিসাবে শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পাবে কোন শিবির? কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।