শাহিদুল হাসান খোকন, বাংলাদেশ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস কখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, হত্যা, প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং একটি রাজনৈতিক পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। আজ তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে চার দশক আগের ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহ আবারও ফিরে আসছে।
প্রায় ছয় বছর ভারতে অবস্থানের পর ১৭ মে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁর দেশে ফেরার মাত্র ১৩ দিন পর, ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
সময়গতভাবে দুটি ঘটনা ছিল খুব কাছাকাছি। আর সেই নৈকট্যই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জন্ম দেয়।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিযোগ উঠেছে যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কিংবা শেখ হাসিনার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে বা ইঙ্গিতে এমন প্রশ্নও তুলেছেন। কিন্তু অভিযোগ এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়।
এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে এমন কোনো চূড়ান্ত, যাচাইযোগ্য ও সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ হাজির হয়নি, যার ভিত্তিতে শেখ হাসিনা বা ভারতের কোনো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলা যায়। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং জিয়ার হত্যাকাণ্ডের সময়গত নৈকট্যের কথা থাকলেও, দুটির মধ্যে কোনো প্রমাণিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্মৃতির শক্তি অনেক সময় প্রমাণের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। আজ সেই স্মৃতিই নতুন করে আলোচনায়।
কারণ জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে। দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কয়েক মাস ধরে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সফরটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নসহ কয়েকটি কূটনৈতিক ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করেছে।
এর মধ্যেই শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক প্রতীকী মিল তৈরি হয়েছে। ১৯৮১ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মাত্র ১৩ দিন পর তিনি নিহত হন। আর ২০২৬ সালে জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রশ্ন তাঁর সামনে। তাঁর ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সময়ে ভারত থেকে আবার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
অবশ্য ইতিহাসের এই দুই সময়ের মধ্যে সরাসরি কোনো ঘটনার যোগসূত্র নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে অতীতের এই ঘটনাগুলো কেন নতুন করে আলোচনায় আসছে?
বিএনপির অনেক নেতা ও সমর্থকের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে জিয়াউর রহমানের ভারত সফর, শেখ হাসিনার ১৯৮১ সালের দেশে ফেরা এবং তার পরপরই জিয়ার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ এসেছে। কেউ সরাসরি, কেউ ইঙ্গিতে ইতিহাসের সেই ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
তাহলে কি বিএনপির ভেতরে একটি রাজনৈতিক আশঙ্কা কাজ করছে? তারেক রহমানের ভারত সফরকে ঘিরে কি দলের কোনো অংশ জিয়াউর রহমানের শেষ পরিণতির কথাও ভাবছে?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বই দিতে পারে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে কেবল একটি বিদেশ সফরের প্রশ্ন নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভারতের সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘ ও জটিল সম্পর্ক এবং চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহমান সন্দেহের একটি প্রবল বয়ান।
জিয়াউর রহমান নিজেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভারত সফর করেছিলেন। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা জাতীয়তাবাদী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাস্তবতা তাঁকে দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে হয়েছিল।
আজ তার ছেলে তারেক রহমানও একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা তাঁর জন্য কেবল রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেরও প্রশ্ন। সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ—দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই জটিলভাবে জড়িয়ে আছে যে, পারস্পরিক যোগাযোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন।
কিন্তু বিএনপির জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি সব সময়ই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। দলের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি বড় অংশ ভারতকে নিয়ে সতর্ক ও সন্দেহপ্রবণ। অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপিকে এখন কূটনীতির বাস্তববাদী পথও অনুসরণ করতে হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই তারেক রহমানের ভারত সফরকে ঘিরে পুরোনো ইতিহাস নতুন করে সামনে আসছে।
সম্ভবত বিএনপির কিছু নেতা ইতিহাসের সেই অধ্যায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাইছেন—ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আবার কেউ হয়তো দলীয় সমর্থকদের কাছে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানটি স্পষ্ট রাখতে চাইছেন।
কিন্তু যখন সেই আলোচনায় ১৯৮১ সালের শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড একসঙ্গে উঠে আসে, তখন প্রশ্নটি আর নিছক কূটনৈতিক থাকে না। সেখানে ইতিহাসের ভয়ও এসে যায়।
তবে ইতিহাসের আদালতে একটি বিষয় পরিষ্কার—সময়গত মিল কোনো ঘটনার প্রমাণ নয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে যত প্রশ্নই তোলা হোক, দুটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ আজও সামনে আসেনি।
কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে প্রমাণিত ইতিহাসের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্মৃতি, সন্দেহ, ভয় এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত বয়ানও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বিএনপির ভেতরে যে দ্বিধা ও আলোচনা চলছে, সেখানে হয়তো সেই পুরোনো ইতিহাসের ছায়াই সবচেয়ে বড়।
ইতিহাস হয়তো হুবহু ফিরে আসে না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের ভয় বারবার ফিরে আসে। আর আজ তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে বিএনপির ভেতরের আলোচনায় ১৯৮১ সালের নাম উচ্চারিত হওয়াই হয়তো তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।