কলকাতা: পরিচয় ছিল—তিনি অ্যামাজনে কাজ করেন। প্রযুক্তির দুনিয়ায় ভাল চাকরি, নির্দিষ্ট বেতন, কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা। হঠাৎই এক ফোন। কয়েক মিনিটের কথোপকথন। তার পরেই বদলে গেল সব। চাকরি নেই। স্বাভাবিক ভাবেই শুরু হয়েছিল নতুন চাকরির খোঁজ। জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো, আবেদন, সাক্ষাৎকার, পরিচিতদের ফোন—চেষ্টা চলেছিল পুরোদমে। মনে হয়েছিল, অ্যামাজনের মতো সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে হয়তো বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু দিন গড়াল। একের পর এক দরজা বন্ধ হল। প্রত্যাখ্যানের তালিকা লম্বা হল। আর সেই সঙ্গে বাড়তে থাকল অনিশ্চয়তা। সেখানেই অবশ্য থেমে গেলেন না হায়দরাবাদের মারিয়া হর্ষিতা।
২০২৬ সালের মার্চে অ্যামাজনের চাকরি হারানোর পর যে মহিলার দিন কাটছিল নতুন কাজের সন্ধানে, তিনিই কয়েক মাস পরে লিখলেন—‘‘এখন আমি ডিম বিক্রি করছি।’’ শুনতে যেন এক লাফে এক জগত থেকে আর এক জগতে চলে যাওয়া। কিন্তু এই বদলের পিছনে রয়েছে হতাশা, চেষ্টা, পরিবারের পাশে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য নতুন রাস্তা খুঁজে নেওয়ার গল্প। চাকরি হারানোর পরে প্রথম দিকে মারিয়ার বিশ্বাস ছিল, দ্রুতই নতুন সুযোগ চলে আসবে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে, কাজ জানেন, ফলে নতুন চাকরি পেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়—এমনটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু বাস্তব ছিল অনেক কঠিন। একের পর এক আবেদন করেও যখন কাঙ্ক্ষিত সুযোগ এল না, তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি।
এই সময় পাশে দাঁড়ান তাঁর স্বামী খানিশকা ডেভিড। অন্যের সংস্থায় চাকরির অপেক্ষা না করে নিজেদের কিছু করার কথা ভাবতে বলেন তিনি। আর সেই ভাবনা থেকেই শুরু এমন এক কাজ, যার সঙ্গে মারিয়ার আগের পেশার কোনও মিলই নেই। ছ’টি মুরগির ছানা। সেই ছয়টিই ছিল নতুন শুরুর প্রথম পুঁজি। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল খুবই সাধারণ। বাড়িতে টাটকা ডিম পাওয়া। সন্তানদের জন্য বাজারের ডিমের বদলে নিজেদের মুরগির ডিম খাওয়ানো। ছোট্ট একটি খাঁচা তৈরি হল। ছানাগুলির দেখাশোনা শুরু করলেন মারিয়া। কিন্তু শুরুতেই এল মজার বিপত্তি। ছ’টি ছানাই বড় হতে হতে দেখা গেল, সব ক’টিই মোরগ!
তাতে অবশ্য উৎসাহ হারাননি তিনি। বরং মুরগি বাড়ল, খাঁচা বড় হল, ধীরে ধীরে বাড়িতে ডিমের জোগানও বাড়তে থাকল। এক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডিম হতে শুরু করল। তখনই মাথায় এল অন্য ভাবনা—যে ডিম বাড়িতে অতিরিক্ত হচ্ছে, তা বিক্রি করা যায় না? সেই প্রশ্ন থেকেই ব্যবসার শুরু। বাড়ির ছোট্ট উদ্যোগ ধীরে ধীরে পোলট্রি ব্যবসার আকার নিতে শুরু করল। যে মহিলা কিছু দিন আগেও কর্পোরেট সংস্থায় ‘প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর কাজ করতেন, তিনিই এখন মুরগি, ডিম, ক্রেতা এবং সরবরাহ নিয়ে ব্যস্ত। জীবনের এই অদ্ভুত বাঁকটিকেই নিজের LinkedIn পোস্টে তুলে ধরেছেন মারিয়া। চাকরি হারানোর কথা যেমন বলেছেন, তেমনই বলেছেন কী ভাবে সেই ধাক্কাই তাঁকে নিজের কিছু করার সাহস দিয়েছে। আর এখানেই তাঁর গল্পটা একটু অন্য রকম।
চাকরি হারালে অনেকের কাছেই প্রথম অনুভূতি হয়—সব শেষ। ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পরিচিত জীবন আচমকা অচেনা হয়ে যায়। মারিয়ার ক্ষেত্রেও সেই অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই ‘সব শেষ’-এর জায়গা থেকেই নতুন করে শুরু করেছেন। এমনকি নিজের পুরনো পেশার দক্ষতাকেও একেবারে ছুড়ে ফেলেননি। প্রযুক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন নিজের ব্যবসার হিসাব-নিকাশ সামলাচ্ছেন। আগে যে ডেটা নিয়ে কাজ করতেন, এখন সেই ডেটাই কাজে লাগছে মুরগির খামারে। তবে কর্পোরেট অফিসের সমস্যার জায়গায় এখন তাঁর জীবনে এসেছে অন্য ধরনের চিন্তা। মুরগির খামারে বুনো প্রাণী ঢুকে পড়া, সাপের উপদ্রব—সবই এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবু সেই জীবনেই যেন নতুন স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন মারিয়া।
কারণ, এখন আর কোনও ম্যানেজারের ফোনের অপেক্ষা করতে হয় না। কোনও নিয়োগকর্তার ই-মেলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। কোনও সাক্ষাৎকারে বসে নিজেকে প্রমাণ করার পরীক্ষাও দিতে হয় না। এখন তাঁর নিজের কাজ। নিজের খামার। নিজের ঝুঁকি। আর নিজের স্বপ্ন।
‘এখন আমি ডিম বিক্রি করছি’—মারিয়ার এই ছোট্ট বাক্যের ভিতরেই তাই লুকিয়ে রয়েছে অনেক বড় একটা গল্প। অ্যামাজনের চাকরি হারানোর কষ্টকে অস্বীকার করেননি তিনি। কিন্তু সেই কষ্টকে নিজের শেষ পরিচয়ও হতে দেননি। ছ’টি ছানা দিয়ে শুরু হওয়া সেই গল্প আজ তাঁকে অন্য এক পরিচয় দিয়েছে। চাকরি তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিল। তিনি কিন্তু কাজকে ছাড়েননি। আর হয়তো সেখানেই মারিয়ার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটাই এমন একটি দরজা খুলে দেয়, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা আগে জানতামই না।