কাঠমান্ডু: আকাশে বৃষ্টি ছিল না। কোনও বড় ভূমিকম্পও হয়নি। তা হলে এত বড় বিপর্যয় এল কী ভাবে? উত্তরটা লুকিয়ে হিমালয়ের প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায়। পাহাড়ের বুকে হিমবাহের একাংশ ভেঙে পড়েছিল। তার সঙ্গে নেমে এসেছিল বরফ, পাথর, মাটি আর বিপুল জল। পাহাড়ি নদী মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল মৃত্যুর স্রোতে। সেই স্রোতে ভেসে গিয়েছে গ্রাম, রাস্তা, সেতু, বাড়ি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—আর হাজার হাজার মানুষের জীবন।
২৬ অগস্টের সেই ভয়াবহ হড়পা বানের পর নেপাল ও চিনের তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১,০০০ পেরিয়েছে। শুধু নেপালেই সরকারি হিসাবে মৃত ৯৮৭ জন। নিখোঁজ ৩,৯১৬। তিব্বতে আরও ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ। ফলে সামনে এখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কত জনের দেহ মিলবে, আর কত জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে?
বিপর্যয়ের শুরু নেপাল-চিন সীমান্তের কাছের পাহাড়ে। উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নীচের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১২০০ মিটার নীচে আছড়ে পড়ে। সঙ্গে ছুটে আসে বিপুল বরফ, পাথর ও মাটি। সেই ধস লহেন্দে নদীর গতিপথ সাময়িক ভাবে আটকে দেয়। তৈরি হয় প্রাকৃতিক বাঁধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বাঁধ ভেঙে জল ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢেউ নেমে আসে নীচের উপত্যকায়। মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। পাহাড়ি জনপদগুলির বাসিন্দাদের হাতে পালানোর সময় ছিল কার্যত না থাকার মতো।
আরও বিস্ময়কর, এই বিপর্যয়ের সময় ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হচ্ছিল না। ফলে প্রথম ধাক্কায় স্থানীয়দের অনেকেই বুঝতেই পারেননি কী আসছে। নদীর জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মিনিটের মধ্যে কাদামাটি, পাথর, বরফ ও জলের স্রোত ছুটে এসে সব কিছু গিলে নেয়। বহু বাড়ি এমন ভাবে ভেসে যায় যে পরে সেখানে বাড়ি ছিল—তার চিহ্নটুকুও খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়েছে।
সুড়ঙ্গের ভিতরে ‘শেষ আশা’
এখন উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় চিন্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি। নেপালের রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার একাধিক প্রকল্পে ৯০০-র বেশি কর্মীর এখনও কোনও খোঁজ নেই বলে আশঙ্কা। তাঁদের কয়েকশো জন পাহাড় কেটে তৈরি সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন। বাইরে থেকে সেই সুড়ঙ্গগুলির মুখ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
ফলে শুরু হয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান। ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পাশাপাশি কোথাও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের পথ খোলার চেষ্টা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ভিতরে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করছেন। সময় এখানে সবচেয়ে বড় শত্রু—সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা মানুষদের জন্য বাতাস, জল এবং খাবারের জোগান কতক্ষণ থাকবে, সেটাই এখন উদ্বেগের।
তবে আশাও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বিপর্যয়ের পর ১১,৮০০-র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেনা ও পুলিশ হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় পৌঁছচ্ছে। কোথাও খাবার, জল, তাঁবু ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আহতদের বিমানে বা হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫,০০০ সেনা ও পুলিশকর্মী উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে রয়েছেন।
এক বাড়ি থেকেই ২৩ দেহ!
উদ্ধারকারীরা যত দুর্গম এলাকায় পৌঁছচ্ছেন, ততই সামনে আসছে মৃত্যুর ভয়াবহ ছবি। নুয়াকোটের বেত্রাবতী এলাকায় একটি বাড়ি থেকে একসঙ্গে ২৩টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। কোথাও নদীর বহু দূরে দেহ মিলছে, কোথাও কাদার নীচে চাপা পড়ে রয়েছে গোটা পরিবার। নিখোঁজ পরিজনের খোঁজে হাসপাতাল, ত্রাণশিবির এবং মৃতদেহ শনাক্তকরণ কেন্দ্রে ভিড় করছেন পরিবারের লোকেরা। অনেক দেহ এখনও শনাক্ত করা যায়নি। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
নিখোঁজের তালিকায় বিদেশিও রয়েছেন বহু। বিপর্যয়ের সময় নেপালে থাকা বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়, আমেরিকান, অস্ট্রেলীয়, ব্রিটিশ ও কানাডীয় নাগরিকের নাম রয়েছে। বহু মানুষ কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা বা ট্রেকিংয়ের জন্য ওই অঞ্চলে ছিলেন। প্রাথমিক তালিকায় শতাধিক ভারতীয়ের নামও ছিল। ফলে কাঠমান্ডু থেকে দিল্লি, বেজিং থেকে ওয়াশিংটন—বিভিন্ন দেশের প্রশাসনও নিখোঁজ নাগরিকদের খোঁজে নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
নদী পেরোনোর সেতু নেই, ৪০ কিলোমিটার রাস্তা উধাও
শুধু প্রাণহানি নয়, বিপর্যয়ের অভিঘাতে নেপালের যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা জলের স্রোতে ধুয়ে গিয়েছে। ফলে বহু পাহাড়ি জনপদ বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। কোথাও উদ্ধারকারী দলকে হেলিকপ্টারে নামতে হচ্ছে, কোথাও পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হচ্ছে দুর্গম এলাকায়।
জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষতিও বড়। একাধিক প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ বিপর্যস্ত হয়েছে। ধ্বংস হওয়া রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্গঠন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও নেপালের সামনে শুরু হবে আরও দীর্ঘ পুনর্গঠনের লড়াই।
আরও বিপদ কি আসছে?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই শেষ নয়। ধসের ফলে তৈরি হওয়া একটি জলাধার বা প্রাকৃতিক হ্রদের জলস্তর বাড়তে থাকায় নতুন করে বাঁধ ভেঙে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ত্রিশূলী থেকে নারায়ণী হয়ে যে নদী ভারতে ঢুকে গণ্ডক নামে পরিচিত, তার জলস্তর নিয়েও নজরদারি চলছে। ফলে নেপালের বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের নদী অববাহিকাতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই বিপর্যয় আবার সামনে এনেছে হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়ার প্রশ্নও। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে গত কয়েক দশকে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। নেপালের হিমবাহগুলিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ হারিয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত করেননি বিজ্ঞানীরা। কিন্তু উষ্ণতা বাড়ার ফলে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
আর তাই নেপালের পাহাড়ে এখন দু’টি লড়াই পাশাপাশি। এক দিকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজ—কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনার শেষ চেষ্টা। অন্য দিকে নদী, পাহাড় ও হিমবাহের নতুন কোনও হুমকি আসছে কি না, তার দিকে নজর।
হিমালয় থেকে নেমে আসা সেই জলস্রোত থেমেছে। কিন্তু নেপালের সামনে এখন প্রশ্ন—এই ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কত জীবন, কত পরিবার, কত অসমাপ্ত গল্প চাপা পড়ে আছে?