নয়াদিল্লি: ৪৩ কিলোমিটার রাস্তা। পেরিয়েছে উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লি। মাঝখানে ব্যস্ত সড়ক, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সীমান্ত এলাকা, ট্র্যাফিক সিগন্যাল। অথচ সেই দীর্ঘ পথ জুড়ে পুলিশের দৃশ্যমান নজরদারির চিত্র কার্যত হাতেগোনা। মাত্র দু’টি ব্যারিকেড। বহু জায়গায় সিসিটিভির উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন। আর সেই ফাঁক দিয়েই একটি চলন্ত বাসে ১৬ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠল চালক ও কন্ডাক্টরের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—এতটা পথ ধরে একটি বাস কী ভাবে পুলিশের নজর এড়িয়ে চলল?
ঘটনাটি গত ৪ অগস্ট রাতের। গ্রেটার নয়ডার পাড়ি চক থেকে দিল্লির কাশ্মীরি গেট—দূরত্ব প্রায় ৪৩ কিলোমিটার। বৃষ্টির রাতে ভুল জায়গায় নেমে পড়েছিলেন ওই কিশোরী। গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একটি স্লিপার বাসে তাঁকে তোলা হয়। অভিযোগ, বাসে ওঠার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। বাসটি চলতে শুরু করলে চালক কুলদীপ এবং কন্ডাক্টর সন্দীপ কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করেন। পরে তাঁকে দিল্লির কাশ্মীরি গেট এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগের ভয়াবহতা এক দিকে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে অন্য একটি ছবি—নজরদারির ফাঁকফোকর। পাড়ি চক থেকে কাশ্মীরি গেট পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কিলোমিটার পথ। এই গোটা রুটে কোথায় কোথায় পুলিশের চেকিং হয়, কতগুলি ব্যারিকেড রয়েছে, কতগুলি সিসিটিভি সক্রিয়—সেই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্তকারীদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানেও দেখা গিয়েছে, এতটা দীর্ঘ পথের তুলনায় দৃশ্যমান পুলিশি নজরদারি অত্যন্ত সীমিত।
পাড়ি চকে রয়েছে পুলিশ বুথ, পিসিআর ভ্যান এবং ব্যারিকেড। তার পরে দিল্লি-নয়ডা সীমান্তের ময়ূর বিহার এলাকায় আরও একটি ব্যারিকেডের দেখা মেলে। কিন্তু সেখানে সব সময় পুলিশকর্মীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি। ব্যস্ত একাধিক মোড় ও ট্র্যাফিক সিগন্যালেও পর্যাপ্ত দৃশ্যমান সিসিটিভি রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণকেন্দ্রেও বাসটির গতিবিধি আগেই শনাক্ত করা যায়নি কেন, উঠছে সেই প্রশ্নও।
আর এখানেই ঘটনার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি। একটি বাস ৪৩ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিল। তার ভিতরে একটি কিশোরীর উপর এমন ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ উঠল। অথচ রাস্তায় কোথাও কি বাসটিকে থামিয়ে যাচাই করা হল? কোনও পুলিশ চেকপয়েন্টে কি তার গতিবিধি নজরে এল? কোনও ক্যামেরায় কি সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়ল?
তদন্তকারীরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরেই বাসটির গতিপথ খুঁজে বার করেন। পরে উত্তর দিল্লির তিমারপুরের একটি পার্কিং এলাকা থেকে অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। বাসটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনার পরে প্রযুক্তিই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগে সেই প্রযুক্তি কোথায় ছিল?
আরও একটি বিষয় তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। যে বাসে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি মেরামতির জন্য রাখা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। পরে সেটিকে কাশ্মীরি গেটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাসটির নিজস্ব সিসিটিভি কার্যকর ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে। ফলে বাসের ভিতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে বাইরে থেকে নজর রাখার সুযোগ আরও কম ছিল।
এই ঘটনায় তাই শুধু অভিযুক্ত চালক-কন্ডাক্টরের ভূমিকা নয়, নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে। বিশেষত দিল্লি-এনসিআরের মতো এলাকায়, যেখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক বাস উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লিতে ঢোকে এবং বেরোয়, সেখানে আন্তঃরাজ্য রুটে নজরদারি কতটা কার্যকর—তা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
২০১২ সালের নির্ভয়া-কাণ্ডের পর দিল্লির গণপরিবহণে নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সিসিটিভি, পুলিশি টহল, চেকিং—একাধিক স্তরের নজরদারির কথা বলা হয়েছিল। তার পরেও যদি একটি বাস ৪৩ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যায় এবং তার ভিতরে এমন অপরাধ ঘটে, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই—নজরদারির এত স্তর পেরিয়ে অপরাধীরা বার বার ফাঁক খুঁজে পাচ্ছে কী ভাবে?
এই ঘটনার তদন্ত এখন অভিযুক্তদের গ্রেফতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কোন পথে বাসটি গিয়েছিল, কোথায় কোথায় তার ছবি ধরা পড়েছে, কোন কোন ক্যামেরা কাজ করছিল না, কোথায় পুলিশের চেকিং ছিল এবং কোথায় ছিল না, সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কারণ, এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো শুধু ‘কে অপরাধ করল’ নয়। বরং ৪৩ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে নজরদারি থাকা সত্ত্বেও অপরাধের সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে পুলিশের চোখ ছিল কোথায়?