নয়াদিল্লি: আকাশে ওঠার পর ইঞ্জিনে গোলমাল। গন্তব্য দিল্লি নয়, ঘুরে আবার গোয়া। মঙ্গলবার সকালে ২২৯ জন যাত্রীকে নিয়ে গোয়া থেকে দিল্লির পথে পাড়ি দিয়েছিল ইন্ডিগোর ৬ই-২১০২। সকাল ৯টা ১৬ মিনিটে উড়ানের পরেই বিমানের একটি ইঞ্জিনে সমস্যা ধরা পড়ে। পাইলটের বার্তার পর দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বিমানটিকে গোয়ায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ‘ফুল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৩৫ মিনিট পরে, ৯টা ৫০ মিনিটে নিরাপদে গোয়ার মনোহর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে বিমানটি।
বিমানটি অবতরণের পর যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়। কোনও যাত্রী বা কর্মী আহত হননি। ইন্ডিগো জানিয়েছে, বিমানটিকে রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সমস্ত ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত সেটি ফের পরিষেবায় ফিরবে না।
একটি বিমান নিরাপদে নেমেছে—স্বস্তির খবর। কিন্তু ঘটনাটি একেবারে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে কি?কারণ, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপঞ্জি খুললেই সামনে আসছে আরও কয়েকটি অস্বস্তিকর ছবি।
১১ অগস্ট রাত। কলকাতা থেকে চেন্নাইগামী ইন্ডিগোর ৬ই-৭২৩। গন্তব্যে পৌঁছনোর ঠিক আগে বিমানের বাঁ-দিকের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ২২৪ জন যাত্রী ও কর্মী ছিলেন বিমানে। রাত ১১টা ২৯ মিনিটে ‘ফুল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে বিমানটি। বিমানবন্দরে জরুরি ব্যবস্থা চালু হয়, অন্য উড়ানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিমানটি নিরাপদে রানওয়েতে নামে। কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
অর্থাৎ, দু’টি ক্ষেত্রেই ইঞ্জিনের সমস্যা। দু’টি ক্ষেত্রেই পাইলট দ্রুত এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলকে জানান। এবং দু’টি ক্ষেত্রেই বিমান নিরাপদে মাটিতে নামে। এখানেই অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ইঞ্জিনে সমস্যা হওয়া এবং বিমান দুর্ঘটনায় পড়া এক জিনিস নয়। আধুনিক যাত্রীবাহী বিমান এমন ভাবেই তৈরি যে একটি ইঞ্জিন বিকল হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অন্য ইঞ্জিনের সাহায্যে বিমান নিয়ন্ত্রিত ভাবে উড়তে এবং অবতরণ করতে পারে। জরুরি অবতরণের প্রস্তুতিও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ।
কিন্তু ছবিটা আরও জটিল হয় ৪ অগস্টের এয়ার ইন্ডিয়া ফুকেট-দিল্লি উড়ান সামনে এলে। এয়ার ইন্ডিয়ার এয়ারবাস এ৩২০ তখন ফুকেট থেকে দিল্লি যাচ্ছিল। আচমকাই বিমানটি প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে যায়। প্রথমে ঘটনাটি তীব্র টার্বুলেন্সের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরে এয়ারবাসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—বিমানের তিনটি হাইড্রলিক সিস্টেমেই অল্প সময়ের জন্য চাপ হারিয়েছিল। প্রায় চার সেকেন্ডের সেই সময়ে এলিভেটর এবং আইলারনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উড়ান-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাময়িক ভাবে সাড়া দিচ্ছিল না। ঘটনায় ২৪ জন আহত হন। বিমানটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত নিরাপদে দিল্লিতে নামে।
তার পরের তদন্তে আরও কিছু তথ্য সামনে আসে। বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত লগে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক সতর্কবার্তা, হাইড্রলিক চাপ কমার সংকেত এবং অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে রিপোর্ট হয়েছে। ঘটনাটিকে এখন গুরুতর ‘সিরিয়াস ইনসিডেন্ট’ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনটি ঘটনা। তিন রকম সমস্যা। কিন্তু একটি সাধারণ প্রশ্ন—বিমান আকাশে ওঠার আগেই কি এই ধরনের বিপদের ইঙ্গিত আরও ভাল ভাবে ধরা সম্ভব?
এখানেই নজর পড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার দিকে। কোনও একটি ঘটনায় যান্ত্রিক ত্রুটি হলেই বিমান সংস্থার গাফিলতি প্রমাণ হয় না। ইঞ্জিন বা অন্য যন্ত্রাংশের আচমকা বিকল হওয়া থেকে শুরু করে সেন্সর, হাইড্রলিক সিস্টেম কিংবা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সমস্যা—প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদা হতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও বিমান সংস্থাকে দায়ী করা ঠিক নয়।
তবে যাত্রীদের প্রশ্নটিও অস্বাভাবিক নয়। বিমান ওড়ার আগে কত স্তরে পরীক্ষা হয়? নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি আগের সতর্কবার্তাগুলিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়? কোনও যন্ত্রাংশে বার বার সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে পরিষেবা থেকে সরিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা কতটা কঠোর?
এই প্রশ্নগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২৫ সালের ১২ জুন আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর। সেই দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তার পর থেকেই ভারতের বিমান-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নজরদারি নিয়ে জনমানসে সতর্কতা বেড়েছে। এখন পরপর গুরুতর ইনসিডেন্ট সামনে আসায় সেই প্রশ্নই ফের ফিরে আসছে।
তবে অন্য ছবিটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গোয়া এবং চেন্নাইয়ের ঘটনাগুলি দেখিয়েছে, বিপদ ধরা পড়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। পাইলটের প্রশিক্ষণ, ককপিটের সিদ্ধান্ত, এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সমন্বয় এবং বিমানবন্দরের জরুরি প্রস্তুতি—সব মিলিয়েই শেষ মুহূর্তে নিরাপত্তার বলয় তৈরি হয়।
তাই আসল প্রশ্ন ‘কেন জরুরি অবতরণ হল’—শুধু সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন, কেন সেই ত্রুটি তৈরি হল এবং সেটি আরও আগে শনাক্ত করা গেল না কেন?
গোয়ার বিমানটি নিরাপদে ফিরেছে। ২২৯ জন যাত্রী বাড়ি ফিরতে পারবেন—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কিন্তু আকাশে বার বার প্রযুক্তিগত বিপত্তির খবর যাত্রীদের মনে যে প্রশ্ন তৈরি করছে, তার উত্তর শুধু ‘সবাই নিরাপদে আছেন’ দিয়ে শেষ হয় না। নিরাপদে নামানো অবশ্যই সাফল্য। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন বিপদ আকাশে ওঠার আগেই ধরা পড়ে।