নয়াদিল্লি: আমেরিকার বাজারে ওষুধ বিক্রি করতে হলে এ বার শুধু ব্যবসা করলেই হবে না, দামের হিসাবও দিতে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। একই ওষুধ বিশ্বের অন্য উন্নত দেশে যে সর্বনিম্ন দামে বিক্রি হচ্ছে, আমেরিকাতেও সেই দামের কাছাকাছি আনতে হবে—ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ বা MFN নীতিতে এ বার সই করল ভারতের ওষুধ সংস্থা সান ফার্মা-সহ ন’টি সংস্থা। বিনিময়ে আমেরিকার সম্ভাব্য শুল্কের ধাক্কা এড়ানোর রাস্তা, আমেরিকায় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ এবং মার্কিন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার সুবিধা মিলল সংস্থাগুলির সামনে।
সোমবার হোয়াইট হাউস থেকে নয়া চুক্তির ঘোষণা করা হয়েছে। সান ফার্মা ছাড়াও তালিকায় রয়েছে Alcon, Astellas Pharma, BeOne Medicines, BridgeBio, CSL, Kyowa Kirin, Teva Pharmaceuticals এবং UCB। এর আগে ১৭টি বড় ওষুধ সংস্থা ট্রাম্পের MFN কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিল। নতুন ন’টি সংস্থা যুক্ত হওয়ায় চুক্তির আওতায় থাকা সংস্থার সংখ্যা বেড়ে হল ২৬। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই সংস্থাগুলির আওতায় আমেরিকার ব্র্যান্ডেড ওষুধের বাজারের প্রায় ৮৯ শতাংশ চলে এসেছে।
কিন্তু MFN আসলে কী? নামটি জটিল হলেও হিসাবটি সহজ। ধরুন, একই ওষুধ আমেরিকায় ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ জার্মানি, ব্রিটেন বা অন্য কোনও উন্নত দেশে সেটিই ১৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি—একই ওষুধের জন্য আমেরিকান রোগী কেন দ্বিগুণ দাম দেবেন? তাই আমেরিকাতেও ওই ওষুধের দাম অন্য উন্নত দেশগুলির সবচেয়ে কম দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হবে। এটাই MFN নীতির মূল কথা।
নতুন চুক্তিতে ন’টি সংস্থাই মার্কিন রাজ্যগুলির Medicaid কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ MFN দামে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে বাজারে আসা কিছু নতুন উদ্ভাবনী ওষুধের ক্ষেত্রেও MFN মূল্যনীতি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, শুধু আজকের ওষুধের দাম নয়, আগামী দিনের নতুন ওষুধের মূল্য নির্ধারণেও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রভাব পড়তে চলেছে।
সান ফার্মার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা সংস্থাটির অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বাজার। ফলে মার্কিন সরকারের সঙ্গে এই সমঝোতা সংস্থাটির ভবিষ্যৎ ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। নির্দিষ্ট ওষুধ কম দামে দেওয়ার বিনিময়ে আমেরিকায় ব্যবসা চালানোর ক্ষেত্রে ট্যারিফের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সব সংস্থার জন্য ট্যারিফ-সুরক্ষার শর্ত এক নয়; চুক্তির কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক ও শুল্ক-সংক্রান্ত বিবরণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
শুধু দাম কমানোর প্রতিশ্রুতিই নয়, আমেরিকার মাটিতে উৎপাদন বাড়ানোও এই সমঝোতার বড় অংশ। ন’টি সংস্থা মিলিয়ে প্রায় ১৯.৬ বিলিয়ন ডলার আমেরিকায় উৎপাদন পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য তাই একসঙ্গে কয়েকটি—আমেরিকায় ওষুধের দাম কমানো, বিদেশি সংস্থাকে দেশে উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহে বিদেশ-নির্ভরতা কমানো।
সান ফার্মা আবার আমেরিকার কৌশলগত ওষুধের মজুতের জন্য অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (API) দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ, শুধু ওষুধের দাম কমানো নয়, আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ-শৃঙ্খল শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ভারতীয় সংস্থাটি ভূমিকা নেবে।
এখানেই রয়েছে ভারতের ওষুধ শিল্পের জন্য বড় প্রশ্ন। আমেরিকায় দাম কমলে এক দিকে রোগীদের খরচ কমতে পারে, কিন্তু অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মুনাফার উপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষত, আমেরিকা যদি বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের সর্বনিম্ন দামের সঙ্গে মার্কিন বাজারকে বার বার তুলনা করে, তা হলে ভারতীয় ওষুধ সংস্থাগুলিকে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মূল্যনীতি নতুন করে সাজাতে হতে পারে।
অন্য দিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই চুক্তি শুধু স্বাস্থ্যনীতির বিষয় নয়, বাণিজ্যনীতিরও হাতিয়ার। বিদেশি সংস্থাগুলিকে আমেরিকায় উৎপাদনে টানা এবং সম্ভাব্য ট্যারিফের চাপকে দর-কষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার—দুই কাজই একসঙ্গে করছে হোয়াইট হাউস। আগের বড় ফার্মা সংস্থাগুলির সঙ্গে হওয়া চুক্তির ধারাবাহিকতাতেই এ বার মাঝারি মাপের আরও ন’টি সংস্থাকে MFN ব্যবস্থায় আনা হল।
ফলে সান ফার্মার চুক্তির তাৎপর্য শুধু একটি ভারতীয় সংস্থার আমেরিকায় ব্যবসা নিয়ে নয়। ভারতের ওষুধ শিল্পের জন্য আমেরিকার বাজারে নতুন নিয়মের ইঙ্গিতও মিলছে। এক দিকে কম দামে ওষুধ দেওয়ার চাপ, অন্য দিকে আমেরিকায় বিনিয়োগের প্রত্যাশা—তার সঙ্গে ট্যারিফের ভয়। ট্রাম্পের নতুন সমীকরণ কার্যত বলছে, “আমেরিকার বাজার চাইলে আমেরিকার দামের নিয়ম এবং আমেরিকার শিল্পনীতিও মানতে হবে।”